বীরভূমের তৃণমূল নেতা অনুব্রত মণ্ডল এবার বিস্ফোরক দাবি করেছেন যে, গরুপাচার মামলায় তাঁর জেলযাত্রার জন্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দায়ী। কেন্দ্রীয় সংস্থার হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর তিনি দীর্ঘদিন দিল্লির তিহাড় জেলে ছিলেন। সেই কারাবাসের প্রসঙ্গ টেনে এবার প্রকাশ্যে অভিষেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন অনুব্রত। তাঁর এই দাবিকে সমর্থন করেছেন সদ্য কালীঘাট শিবির ছেড়ে বেরিয়ে আসা কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্রও। মদনের দাবি, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য অনেক নেতাকেই জেলে যেতে হয়েছে এবং যাঁরা টাকা দেননি, তাঁরাই জেল খেটেছেন। তবে এই অভিযোগগুলির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ্যে আসেনি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির ছেড়ে বুধবার ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে যোগ দেন মদন মিত্র। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে অনুব্রত মণ্ডল দাবি করেন, আগামী দিনে আরও অনেক নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির ছেড়ে চলে যাবেন। তাঁর অভিযোগ, দলের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ই দায়ী। অনুব্রত বলেন, “আমি জেলে গেলাম কেন? কার জন্য গেলাম? অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য।” তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান, তিনি এখনও নিজেকে তৃণমূলেরই কর্মী মনে করেন। তাঁর কথায়, “ঋতব্রতও তৃণমূল, আমিও তৃণমূল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে অনেক দিন ছিলাম, প্রথম থেকেই ছিলাম। এখনও তৃণমূলেই আছি।”
বুধবার শিবির পরিবর্তনের পর থেকেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন মদন মিত্র। তাঁর দাবি, দলের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য একমাত্র অভিষেকই দায়ী। মদন বলেন, “ইডির চেয়েও ভয়ঙ্কর ‘এবি’। দল চালাত হিটলারের মতো। ওর জন্য অনেককে জেলে যেতে হয়েছে। যে মাল দেয়নি, তাকেই জেলে যেতে হয়েছে।” পরে সাংবাদিকরা ‘মাল’ বলতে কী বোঝাতে চেয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মাল মানে টাকা।” ভোটের আগে কেন এসব কথা বলেননি, সেই প্রশ্নের জবাবে মদনের দাবি, তখন মুখ খুললে তাঁকেও জেলে যেতে হতে পারত। তবে মদন মিত্রের এই অভিযোগগুলির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে এখনও এ বিষয়ে কোনও প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি।
উল্লেখ্য, পুরসভার নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় মঙ্গলবার ইডি মদন মিত্রের স্ত্রী ও তাঁর দুই ছেলেকে তলব করে। এরপরই তিনি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের বিধায়ক সন্দীপন সাহার বাড়িতে যান এবং বুধবার বিধানসভায় গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সেই শিবিরে যোগ দেন। এই ঘটনাকে ঘিরে তৃণমূলের একাংশের দাবি, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার চাপের কারণেই মদন শিবির পরিবর্তন করেছেন। একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে অনুব্রত মণ্ডলকে নিয়েও। তবে অনুব্রত এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “ও সব বাজে কথা। আমি ও সবে ভয় পাই না।” তিনি আরও দাবি করেন, লোকসভা ভোটে পরাজয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে চারবার ফোন করেছিলেন। এদিকে গরুপাচার মামলায় জেল থেকে ফেরার পর বীরভূমের রাজনীতিতে অনুব্রতের সক্রিয়তা অনেকটাই কমে যায় এবং কাজল শেখের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধও প্রকাশ্যে আসে। তাঁর অভিযোগ, তাঁকে ভোটের দায়িত্ব ও প্রচার থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। এর আগেও তিনি দলের পরাজয়ের জন্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও আইপ্যাকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এবার সেই অভিযোগ আরও এক ধাপ এগিয়ে নিজের জেলযাত্রার জন্যও অভিষেককে দায়ী করেছেন। তবে অনুব্রত ও মদন মিত্রের এই অভিযোগগুলির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে এখনও কোনও প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি।
এই বিতর্কের মধ্যেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়িয়ে মন্তব্য করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, অভিষেক এবং তাঁর স্ত্রী রুজিরাকেও একাধিকবার কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তলবে হাজিরা দিতে হয়েছে। মমতার কথায়, দেড় বছরের সন্তানকে নিয়েও রুজিরা সিবিআই দফতরে গিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, চাইলে সেই সময় অভিষেক ‘সেটিং’ করে বিষয়টি মিটিয়ে নিতে পারতেন এবং হয়রানির মুখে পড়তে হতো না। কিন্তু তিনি তা করেননি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, অভিষেক কোনও বেআইনি সমঝোতার পথে হাঁটেননি বলেই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জবাব তিনি নিজের অবস্থান থেকেই দিয়েছেন। তবে এই মন্তব্য সম্পূর্ণভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক বক্তব্য, যার স্বাধীন যাচাই এই প্রতিবেদনে করা সম্ভব নয়।
