বিবাহবিচ্ছেদের পর স্ত্রীকে খোরপোশ দিতে হবে কি না, তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে। তবে ভারতীয় আইনে এই বিষয়ে কোনও নির্দিষ্ট বা বাধ্যতামূলক হিসাব বা ফর্মুলা নেই। আদালত প্রতিটি মামলার পরিস্থিতি আলাদাভাবে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। স্বামী-স্ত্রীর আয়, আর্থিক সামর্থ্য, জীবনযাত্রার মান, বিবাহের সময়কাল, নির্ভরশীল সদস্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় বিচার করেই খোরপোশের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। তাই সব ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য হয় না এবং প্রতিটি মামলার সিদ্ধান্ত তার নিজস্ব পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে।
বিবাহবিচ্ছেদের পর স্ত্রীকে কি খোরপোশ দিতেই হবে
খোরপোশ সংক্রান্ত প্রতিটি মামলায় আদালত সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি, স্বামী-স্ত্রীর আর্থিক অবস্থা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নেয়। পারিবারিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং ম্যাগনাস লিগ্যাল সার্ভিসেস এলএলপির পার্টনার নিকিতা আনন্দের মতে, খোরপোশের পরিমাণ নির্ধারণের সময় আদালত শুধু স্বামী-স্ত্রীর বর্তমান আয়ই নয়, তাঁদের উপার্জনের সম্ভাবনা, বৈবাহিক জীবনে উভয়ের অবদান, জীবনযাত্রার মান এবং ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়গুলিকেও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে। তাই প্রতিটি মামলার রায় তার নিজস্ব পরিস্থিতি ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হয়।
কোন কোন বিষয় বিবেচনা করে আদালত খোরপোশের পরিমাণ নির্ধারণ করে?
এই প্রসঙ্গে একটি উদাহরণও দেন পারিবারিক আইন বিশেষজ্ঞ নিকিতা আনন্দ। তাঁর মতে, কোনও গৃহবধূ যদি প্রায় ২০ বছর ধরে সংসার ও সন্তানদের দেখাশোনার জন্য নিজের কর্মজীবন ছেড়ে দেন, তাহলে বিবাহবিচ্ছেদের পর তাঁর সম্মানজনক ও স্বাভাবিক জীবনযাপন নিশ্চিত করতে আদালত খোরপোশ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারে। তবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আদালত স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য, আয় এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে।
যদিও প্রতিটি মামলার পরিস্থিতি আলাদা হয়, তবুও যদি সন্তানদের লালন-পালনের দায়িত্ব বা অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা একজনের উপর বেশি পড়ে, তাহলে আদালত প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক সহায়তার নির্দেশ দিতে পারে। অনেকেরই ধারণা, শুধুমাত্র স্ত্রীই খোরপোশ দাবি করতে পারেন। তবে বাস্তবে হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৫৫-এর ২৪ ও ২৫ ধারা অনুযায়ী বিশেষ পরিস্থিতিতে স্বামীও খোরপোশের আবেদন করার অধিকার রাখেন। যদিও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন ঘটনা খুবই বিরল এবং সাধারণত তখনই প্রযোজ্য হয়, যখন স্বামী নিজে উপার্জনে অক্ষম বা আর্থিকভাবে অসহায় বলে আদালতের কাছে প্রমাণ করতে পারেন।
শুধু স্ত্রী নয়, বিশেষ পরিস্থিতিতে স্বামীও কি খোরপোশ দাবি করতে পারেন?
পারিবারিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কোনও স্বামী শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বা অন্য কোনও বৈধ কারণে উপার্জনে অক্ষম হন এবং তিনি আর্থিকভাবে স্ত্রীর উপর নির্ভরশীল ছিলেন বলে আদালতে প্রমাণ করতে পারেন, তাহলে আদালত তাঁর খোরপোশের আবেদনও বিবেচনা করতে পারে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই তথ্য-প্রমাণ ও মামলার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেই আদালত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। অন্যদিকে, স্বামী-স্ত্রীর আয় এবং আর্থিক অবস্থা যদি প্রায় সমান হয়, তাহলে খোরপোশ দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। সুপ্রিম কোর্টও একাধিক রায়ে জানিয়েছে, খোরপোশের মূল উদ্দেশ্য হল আর্থিকভাবে নির্ভরশীল জীবনসঙ্গীকে সুরক্ষা দেওয়া, অন্য পক্ষকে শাস্তি দেওয়া নয়। তবে যদি সন্তানদের লালন-পালনের দায়িত্ব বা অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা একজনের উপর বেশি পড়ে, সেক্ষেত্রে আদালত প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক সহায়তার নির্দেশ দিতে পারে।
