সাদিকুল খান কলকাতা: E20 পেট্রোল নিয়ে গাড়ির মালিকদের মধ্যে এখন নানা প্রশ্ন উঠছে। অনেকের অভিযোগ, এই পেট্রোল ব্যবহারের পর গাড়ির মাইলেজ আগের তুলনায় কিছুটা কমে যাচ্ছে। শুধু গাড়ির মালিকই নন, পেট্রোল পাম্প মালিকদের কাছ থেকেও একই ধরনের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রও স্বীকার করেছে যে E20 পেট্রোল ব্যবহারের কারণে কিছু গাড়ির মাইলেজ প্রায় ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। তবে মাইলেজ কমলেও E20 পেট্রোলের কারণে গাড়ির ইঞ্জিন বা অন্য কোনও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে, এমন কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি বলে কেন্দ্রের দাবি।
দেশজুড়ে ইথানল মিশ্রিত E20 পেট্রোল চালু হওয়ার পর থেকেই গাড়ির ইঞ্জিনের নিরাপত্তা, মাইলেজ এবং বিশেষ করে পুরনো গাড়িগুলির ওপর এর প্রভাব নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। পেট্রোল পাম্প মালিকদের একাংশের দাবি, এই রাজ্যের মতো আর্দ্র আবহাওয়ার জায়গায় পেট্রোলে ৫ শতাংশের বেশি ইথানল মেশানো উচিত নয়, সেখানে ইথানলের মাত্রা বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, E20 পেট্রোল ব্যবহারের পর অনেক গাড়ির মাইলেজ কমে যাচ্ছে, ইঞ্জিন ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশে সমস্যা দেখা দিচ্ছে এবং তেলের ট্যাঙ্কে মরচে ধরার মতো ঘটনাও ঘটছে।
E20 পেট্রোল কী? কীভাবে তৈরি হয়?
যাঁরা নিজের গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন, E20 পেট্রোল নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ আরও বেশি। অনেক চালকের অভিযোগ, এই জ্বালানি ব্যবহারের পর গাড়ির মাইলেজ কমার পাশাপাশি ইঞ্জিনেও নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বর্তমানে পেট্রোল পাম্পগুলিতে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানির পাশাপাশি E20 লেখা বোর্ডও দেখা যাচ্ছে। আসলে E20-এর ‘E’ এসেছে Ethanol থেকে এবং ‘20’ বোঝায় পেট্রোলের সঙ্গে প্রায় ২০ শতাংশ ইথানল মেশানো হয়েছে। অর্থাৎ এক লিটার E20 পেট্রোলে থাকে প্রায় ২০ শতাংশ ইথানল এবং ৮০ শতাংশ পেট্রোল। ইথানল মূলত এক ধরনের অ্যালকোহল, যা দাহ্য এবং জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। ভারতে কৃষিজ পণ্য থেকেই প্রধানত ইথানল তৈরি করা হয়। আখের রস, চিনি ও চিনির সিরাপ, চিটে গুড়, ভুট্টা, ভাঙা চাল এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্ষতিগ্রস্ত খাদ্যশস্য ডিস্টিলেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইথানলে পরিণত করা যায়।
E20 পেট্রোলে কি সত্যিই নষ্ট হচ্ছে গাড়ির ইঞ্জিন?
ভারতে ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি ব্যবহারের শুরুটা হয়েছিল ২০০১ সালে পরীক্ষামূলকভাবে। এরপর ২০০৬ সালে দেশের কয়েকটি রাজ্যে E5 পেট্রোল চালু করা হয়। ২০১৮ সালের National Policy on Biofuels এবং ২০২১ সালে নীতি আয়োগের তৈরি রোডম্যাপের ভিত্তিতে ধীরে ধীরে ইথানল উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানো হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে পেট্রোলে ২০ শতাংশ ইথানল মেশানোর লক্ষ্যে পৌঁছয় কেন্দ্র। তবে E20 পেট্রোল চালু হওয়ার পর থেকেই গাড়িচালকদের একাংশ মাইলেজ কমে যাওয়া এবং আগের তুলনায় বেশি জ্বালানি খরচ হওয়ার অভিযোগ করছেন। তাঁদের দাবি, একই দূরত্ব যেতে এখন বেশি পেট্রোল লাগছে, ফলে গাড়ি চালানোর খরচও বাড়ছে। যদিও E20 ব্যবহারের উদ্দেশ্য শুধু জ্বালানি আমদানির উপর নির্ভরতা কমানো নয়, এর পিছনে সরকারের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত লক্ষ্যও রয়েছে বলে বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
E20 পেট্রোল চালুর পিছনে সরকারের অন্যতম অর্থনৈতিক লক্ষ্য হল অপরিশোধিত খনিজ তেলের আমদানি কমিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা। একই সঙ্গে কৃষিজ পণ্য থেকে ইথানল তৈরি হওয়ায় এর সঙ্গে যুক্ত কৃষক ও কৃষিভিত্তিক শিল্পও উপকৃত হতে পারে। পরিবেশের দিক থেকেও ইথানলকে তুলনামূলকভাবে কম দূষণকারী জৈব জ্বালানি হিসেবে ধরা হয়, কারণ এর ব্যবহারে গাড়ি থেকে নির্গত কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে গাড়ির ইঞ্জিন ও মাইলেজ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পেট্রোলের তুলনায় ইথানলের এনার্জি কনটেন্ট কম হওয়ায় E20 ব্যবহার করলে কিছু গাড়িতে মাইলেজ কিছুটা কমতে পারে। পাশাপাশি, দীর্ঘদিন ইথানলের সংস্পর্শে থাকলে পুরনো বা E20-এর উপযোগী নয় এমন গাড়ির কিছু রবার ও প্লাস্টিকের যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
কেন্দ্রও স্বীকার করেছে, E20 পেট্রোল ব্যবহারের ফলে কিছু গাড়ির মাইলেজ প্রায় ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। তবে এই জ্বালানি নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই মতভেদ দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক মহলেও। বেলেঘাটার বিধায়ক ও ‘কালীঘাট তৃণমূল’-এর মুখপাত্র কুণাল ঘোষ E20 চালুর সিদ্ধান্তকে এক কথায় ‘হঠকারী সিদ্ধান্ত’ বলে কটাক্ষ করেছেন। অন্যদিকে, বিভিন্ন গবেষণার রিপোর্টের উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণমন্ত্রী নিতিন গডকড়ী সংসদে জানিয়েছেন, E20 ব্যবহারের কারণে গাড়ির ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে, এমন কোনও প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের তরফেও জানানো হয়েছে, E20 ব্যবহারে গাড়ির ক্ষতি হয়—এমন অভিযোগের কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। আবার রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী ও বিজেপি বিধায়ক দিলীপ ঘোষের দাবি, এই সিদ্ধান্ত বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করেই নেওয়া হয়েছে। ফলে মাইলেজ কমা, ইঞ্জিনের নিরাপত্তা এবং পুরনো গাড়ির ওপর প্রভাব নিয়ে E20 পেট্রোলকে ঘিরে বিতর্ক এখনও অব্যাহত।
