প্রহ্লাদ ভেঙ্কটেশ জোশি (Prahlad Venkatesh Joshi) একজন ভারতীয় রাজনীতিবিদ এবং ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র অন্যতম বর্ষীয়ান নেতা। কর্ণাটকের ধারওয়াড় (Dharwad) লোকসভা কেন্দ্র থেকে তিনি একাধিকবার সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সাংগঠনিক নেতৃত্ব, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সংসদীয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান গড়ে তুলেছেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নেও তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে আসছেন।
প্রহ্লাদ জোশির জীবনী
| বিষয় | তথ্য |
| নাম | প্রহ্লাদ ভেঙ্কটেশ জোশি |
| জন্ম | ২৭ নভেম্বর ১৯৬২ |
| জন্মস্থান | ধারওয়াড়, কর্ণাটক |
| রাজনৈতিক দল | ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) |
| লোকসভা কেন্দ্র | ধারওয়াড় |
| পেশা | রাজনীতিবিদ |
| জাতীয়তা | ভারতীয় |
শিক্ষাগত যোগ্যতা
প্রহ্লাদ জোশী ১৯৬২ সালের ২৭ নভেম্বর তৎকালীন মহীশূর রাজ্যের (বর্তমান কর্ণাটক) বিজাপুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ভেঙ্কটেশ জোশী ভারতীয় রেলের একজন কর্মচারী ছিলেন এবং মা মালতীবাঈ জোশী ছিলেন গৃহিণী। তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় রেলওয়ে স্কুলে। পরে হাবলীর নিউ ইংলিশ স্কুল থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং উচ্চশিক্ষার জন্য হাবলীর শ্রী কাদাসিদ্ধেশ্বর আর্টস কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে তিনি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই সমাজসেবা, জনকল্যাণমূলক কাজ এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শক্ত ভিত্তি গড়ে দেয় এবং জনজীবনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ পথচলার সূচনা করে।
রাজনৈতিক জীবন
কর্মজীবনের শুরুতে প্রহ্লাদ জোশী শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে জনসেবার প্রতি আগ্রহ থেকেই তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে কর্ণাটকের হাবলীর ইদগাহ ময়দানে জাতীয় পতাকা (তিরঙ্গা) উত্তোলন আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একই সময়ে “কাশ্মীর বাঁচাও আন্দোলন”-এর নেতৃত্ব দিয়ে তিনি রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে একজন সক্রিয় ও পরিচিত রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। পরবর্তীকালে তিনি ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ধারওয়াড় জেলা সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং দলের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে জেলায় বিজেপির সাংগঠনিক কার্যক্রম নতুন গতি পায় এবং তিনি ধীরে ধীরে রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন।
২০০৪ সালের ১৪তম লোকসভা নির্বাচনে প্রহ্লাদ জোশী প্রথমবার কর্ণাটকের ধারওয়াড় লোকসভা কেন্দ্র থেকে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওই নির্বাচনে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (আইএনসি)-এর প্রার্থী বি. এস. পাতিলকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর একই কেন্দ্র থেকে টানা একাধিকবার জয়ী হয়ে তিনি ধারওয়াড়ের অন্যতম প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় সাংসদ হিসেবে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন। বিশেষ করে ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে কর্ণাটকের অন্যতম বড় ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করে তিনি রাজ্য রাজনীতিতে নিজের প্রভাব আরও বাড়ান। পরে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনেও এক লক্ষের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে ধারওয়াড়ে তাঁর জনপ্রিয়তা আরও একবার প্রমাণিত হয়।
রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি প্রহ্লাদ জোশীর সাংগঠনিক ভিত্তিও ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। শৈশব থেকেই তিনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আরএসএস-এর বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা এবং জনসেবার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও নেতৃত্বের ধরন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর উত্থানের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব
২০১৯ সালের ৩০ মে প্রহ্লাদ জোশী ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এরপর তাঁকে সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী, কয়লা মন্ত্রী এবং খনি মন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই তিনটি মন্ত্রকের দায়িত্ব তিনি ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত পালন করেন এবং সংসদ পরিচালনা থেকে শুরু করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ সংক্রান্ত বিভিন্ন নীতি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর গঠিত নতুন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় তাঁকে উপভোক্তা বিষয়ক, খাদ্য ও গণবণ্টন মন্ত্রী (Consumer Affairs, Food and Public Distribution) এবং নতুন ও নবায়নযোগ্য শক্তি মন্ত্রী (New and Renewable Energy)-এর দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই নির্বাচনে তিনি ধারওয়াড় লোকসভা কেন্দ্র থেকে টানা পঞ্চমবারের মতো সাংসদ নির্বাচিত হয়ে একটি উল্লেখযোগ্য নজির গড়েন। এটি ওই কেন্দ্র থেকে কোনো প্রার্থীর ধারাবাহিক সর্বাধিক জয়ের অন্যতম রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। যদিও জয়ের ব্যবধান আগের নির্বাচনের তুলনায় কিছুটা কমে যাওয়ায় তিনি সে বিষয়ে প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়াও জানিয়েছিলেন।
২০২৬ সালে নিট (NEET) প্রশ্নপত্র ফাঁস বিতর্ককে ঘিরে দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। এরপর ২৫ জুলাই প্রহ্লাদ জোশীকে তাঁর বর্তমান মন্ত্রিত্বের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রকের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, যার মাধ্যমে তিনি দেশের শিক্ষা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও সাময়িকভাবে গ্রহণ করেন।
পুরস্কার ও সম্মান
প্রহ্লাদ জোশি সরকারি পদে থেকে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রশংসিত হলেও ব্যক্তিগতভাবে বড় আন্তর্জাতিক পুরস্কারের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত নন।
প্রহ্লাদ জোশি ভারতের একজন অভিজ্ঞ ও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ। কর্ণাটক থেকে জাতীয় রাজনীতিতে নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়ে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেছেন। সংসদ পরিচালনা, জ্বালানি ও খনিজ খাতের উন্নয়ন এবং সাংগঠনিক নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি ভারতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা তাঁকে দেশের অন্যতম পরিচিত বিজেপি নেতাদের মধ্যে স্থান দিয়েছে।
