গত সপ্তাহ থেকে সোনার দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। যদিও চলতি বছরের শুরু থেকে সোনার বাজারে একাধিকবার দাম ওঠানামা করেছে, তবুও অনেক ক্রেতা ও বিনিয়োগকারী এখনও অপেক্ষা করছেন কখন দাম কিছুটা কমবে, যাতে তুলনামূলক কম দামে সোনা কেনা যায়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সোনার দাম ঠিক কোথায় গিয়ে সর্বনিম্ন হবে, তা আগে থেকে নির্ভুলভাবে বলা সম্ভব নয়।
২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ভারতে ১০ গ্রাম সোনার দাম কখনও ১ লক্ষ টাকার গণ্ডি পেরোয়নি। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামে জোরালো উত্থান, ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার চাহিদা বাড়ার প্রভাবে ২৪ জুলাই সেই দাম প্রায় ১.৪৩ লক্ষ টাকা প্রতি ১০ গ্রামে পৌঁছে যায়। স্বাভাবিকভাবেই এখন অনেকের মনে একটাই প্রশ্ন—সোনার দাম কি আবার ১ লক্ষ টাকার নিচে নেমে আসতে পারে?
সোনার দামে বড় পতনের সম্ভাবনা কতটা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সোনার দামে বড় ধরনের পতনের সম্ভাবনা খুবই কম। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে সোনা কিনে চলায় বাজারে শক্তিশালী চাহিদা তৈরি হয়েছে। অগমন্ট-এর হেড অব রিসার্চ রেনিশা চানানির মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ১০ গ্রাম সোনার দাম আবার ১ লক্ষ টাকার নিচে নেমে আসার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। তাঁর মতে, এটি স্বাভাবিক বাজার পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত নয়, বরং কোনও বড় অর্থনৈতিক বা বৈশ্বিক অস্থিরতা দেখা দিলে তবেই এমন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তিনি আরও জানান, ২০২৬ সালে প্রতি ১০ গ্রাম সোনার দাম ১.৪০ লক্ষ থেকে ১.৫০ লক্ষ টাকা বা তারও বেশি থাকার সম্ভাবনাই বেশি। তবে এর অর্থ এই নয় যে দামে কোনও সংশোধন হবে না। স্বল্পমেয়াদে ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত দাম কমা স্বাভাবিক বাজারচক্রের অংশ, কিন্তু এমন সংশোধনকে বড় ধস বা সোনার বাজারে ক্র্যাশ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
কোন কোন কারণে সোনার দাম কমতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কারণ একসঙ্গে কাজ করলে ভবিষ্যতে সোনার দামে বড় পতন দেখা যেতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মার্কিন ডলারের শক্তিশালী হওয়া, কারণ ডলার শক্তিশালী হলে সাধারণত সোনার চাহিদা কমে যায় এবং দামের ওপর চাপ পড়ে। এছাড়া, যদি মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ সুদের হার বজায় রাখে, তাহলে অনেক বিনিয়োগকারী সোনার পরিবর্তে বেশি রিটার্ন পাওয়া যায় এমন অন্যান্য সম্পদে বিনিয়োগ করতে পারেন। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা কমে গেলে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার চাহিদাও হ্রাস পেতে পারে। এছাড়া বর্তমানে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে হারে সোনা কিনছে, সেই কেনাকাটা যদি কমে যায়, তাহলে বাজারে চাহিদা কমে সোনার দামের ওপর নিম্নমুখী চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে।
এখনই সোনা কিনবেন, নাকি অপেক্ষা করবেন?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, সোনায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একেবারে সর্বনিম্ন দামের অপেক্ষায় বসে থাকা সব সময় বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ বাজার ঠিক কোথায় গিয়ে তলানি ছুঁবে, তা আগে থেকে নির্ভুলভাবে বলা প্রায় অসম্ভব। তাই শুধু দাম আরও কমবে এই আশায় সিদ্ধান্ত পিছিয়ে না দিয়ে নিজের আর্থিক লক্ষ্য, বাজেট এবং বিনিয়োগের সময়সীমা বিবেচনা করেই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। বোনাঞ্জার সিনিয়র রিসার্চ অ্যানালিস্ট নিরপেন্দ্র যাদবের মতে, অতীতেও সোনার দামে ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত সংশোধন হয়েছে, যা বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামারই অংশ। তাই স্বল্পমেয়াদি দামের পরিবর্তন দেখে আতঙ্কিত না হয়ে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিনিয়োগ করাই বেশি যুক্তিযুক্ত।
বিনিয়োগকারীদের জন্য কী হতে পারে সঠিক কৌশল?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সোনায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একবারে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করার পরিবর্তে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করাই বেশি নিরাপদ ও কার্যকর কৌশল। এতে দামের ওঠানামার প্রভাব কিছুটা কমে এবং দীর্ঘমেয়াদে গড় ক্রয়মূল্যও নিয়ন্ত্রণে থাকে। পাশাপাশি, বাজারে সাময়িক উত্থান-পতন বা বিভিন্ন খবরের ভিত্তিতে আতঙ্কিত হয়ে কেনাবেচার সিদ্ধান্ত না নেওয়াই ভালো। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য সোনা পোর্টফোলিওতে বৈচিত্র্য (Diversification) আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। তবে যাঁরা স্বল্পমেয়াদে লাভের আশায় বিনিয়োগ করতে চান, তাঁদের সোনার দামের স্বাভাবিক ওঠানামার ঝুঁকি সম্পর্কে আগে থেকেই প্রস্তুত থাকা উচিত।
