উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা যাঁদের রয়েছে, তাঁরা জানেন যে নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার পরেও কখনও কখনও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে (High Blood Pressure)। এমনকি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের আগে অনেক সময় রোগীর রক্তচাপ স্বাভাবিক না হওয়ায় অপারেশনও পিছিয়ে দিতে হয়। অথচ রোগী নিয়ম মেনেই ওষুধ খেয়ে থাকেন। তাই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে শুধু ওষুধের উপর নির্ভর করলেই হবে না। পুষ্টিবিদদের মতে, ওষুধের পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জীবনযাপন এবং প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। কী খাচ্ছেন, কতটা খাচ্ছেন এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কতটা নিয়ম মেনে চলছেন—এসবের উপরও অনেকটাই নির্ভর করে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ভালো থাকা।
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক এবং কিডনির সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ওষুধের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। পুষ্টিবিদেরা সাধারণত খাদ্যতালিকায় ফল, শাকসব্জি, বাদাম, তৈলাক্ত মাছ এবং দারচিনির মতো কিছু খাবার রাখার পরামর্শ দেন। মার্কিন কৃষি দফতরের (USDA) একটি গবেষণাতেও প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে ফল, সব্জি এবং পাতাজাতীয় সব্জি খাওয়ার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে উচ্চ রক্তচাপ থাকলে কোন ফল বা খাবার বেশি উপকারী, তা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন থাকে। বিভিন্ন গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে পুষ্টিবিদেরা এমন ১৩টি খাবারের কথা তুলে ধরেছেন, যা উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে খাদ্যতালিকায় কিছু স্বাস্থ্যকর খাবার রাখা উপকারী হতে পারে। বিভিন্ন গবেষণা ও পুষ্টিবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী এমন ১৩টি খাবার হল—
১। কলা: কলায় থাকা পটাশিয়াম শরীরে অতিরিক্ত সোডিয়ামের প্রভাব কমাতে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
২। বিট: বিটে থাকা নাইট্রেট শরীরে রক্তনালিগুলিকে প্রসারিত করতে সাহায্য করে। ২০২২ সালের একটি গবেষণাতেও বিটের রস সিস্টোলিক রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে বলে উঠে এসেছে। তবে নিয়মিত বিটের রস খাওয়ার পরিবর্তে স্যালাড বা রান্না করেও বিট খাওয়া যেতে পারে।
৩। তরমুজ: তরমুজে থাকা সিট্রুলিন নামে অ্যামাইনো অ্যাসিড রক্তনালির কার্যকারিতা ও রক্ত সঞ্চালনে সহায়তা করতে পারে, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে।
৪। ওটস: ওটসে থাকা বিটা-গ্লুকান হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। নিয়মিত ওটস খাওয়া কোলেস্টেরল ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
৫। পাতাজাতীয় সব্জি: পালং শাক, সর্ষে শাক, বাঁধাকপির মতো সব্জিতে থাকা পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
৬। রসুন: রসুনে থাকা কিছু সক্রিয় যৌগ রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যকারিতায় সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি এটি কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণেও কিছুটা ভূমিকা রাখতে পারে।
৭। বাদাম: কাঠবাদাম, আখরোটের মতো বাদামে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, ম্যাগনেশিয়াম ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান রয়েছে, যা হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
৮। লেবু জাতীয় ফল: কমলালেবু, মৌসুমি, পাতিলেবুর মতো সাইট্রাস ফলে ভিটামিন C ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ উপাদান থাকে। সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে এগুলি হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।
৯। তৈলাক্ত মাছ: আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরামর্শ অনুযায়ী, সপ্তাহে অন্তত দু’বার তৈলাক্ত মাছ খাওয়া যেতে পারে। এতে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।
১০। ফারমেন্টেড খাবার: দই, কিমচি, কমবুচা ইত্যাদি ফারমেন্টেড খাবারে উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে। পরিমিত পরিমাণে এগুলি খাওয়া অন্ত্র ও হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে উচ্চ রক্তচাপ থাকলে বেশি নুন দেওয়া ফারমেন্টেড খাবার এড়িয়ে চলা ভালো।
১১। ডাল জাতীয় খাবার: মসুর ডাল, ছোলা, রাজমার মতো ডাল জাতীয় খাবারে ফাইবার, প্রোটিন, পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম থাকে। নিয়মিত খাদ্যতালিকায় এগুলি রাখলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।
১২। দারচিনি: দারচিনিতে থাকা কিছু উদ্ভিজ্জ যৌগ রক্তে শর্করা ও রক্তচাপের উপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে এটিকে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
১৩। টম্যাটো: টম্যাটোয় থাকা লাইকোপিন একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট, যা হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। কিছু গবেষণায় টম্যাটো খাওয়ার সঙ্গে সিস্টোলিক রক্তচাপ কমার সম্পর্কও পাওয়া গেছে।
