রাতের ট্রেনে যাত্রার একটা আলাদা রোমাঞ্চ আছে। যাত্রীরা খাওয়া-দাওয়া সেরে ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়েন, কেউ কেউ আবার জানালার পাশে বসে গল্প করেন বা বাইরে তাকিয়ে থাকেন। কিন্তু পুরো ট্রেন যখন ঘুমের আবহে ডুবে যায়, তখন একেবারে সামনে ইঞ্জিন কেবিনে দু’জন মানুষ সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকেন—তাঁরা হলেন লোকো পাইলট এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট লোকো পাইলট। আপনার গন্তব্যে নিরাপদে পৌঁছানো নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা নিরবচ্ছিন্নভাবে জেগে থাকেন, ট্রেন চালনা, সংকেত পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপত্তার প্রতিটি বিষয় খেয়াল রাখেন।
তাঁরা কী কথা বলেন, সেটা অনেকের কাছেই কৌতূহলের বিষয়। লোকো পাইলট এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট লোকো পাইলট শুধু সাধারণ কথাবার্তা নয়, মূলত পুরো যাত্রার নিরাপত্তা নিয়েই ক্রমাগত যোগাযোগ রাখেন। সামনে থাকা প্রতিটি সিগন্যাল একজন জোরে বলে দেন—এর রং, নম্বর বা নির্দেশ কী, আর অন্যজন সঙ্গে সঙ্গে সেটি যাচাই করে নিশ্চিত করেন। কখনও গতি কমানো, কখনও ব্রেক প্রস্তুত রাখা, আবার কখনও ট্র্যাকের বিশেষ সতর্কতা—সবই তাঁরা নিয়ম মেনে উচ্চস্বরে বলে, শোনে এবং নিশ্চিত করে। এই ধারাবাহিক “কথা বলা ও যাচাই” প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই শত শত কিলোমিটার জুড়ে রাতভর নিরাপদভাবে ট্রেন চলতে থাকে।
রেলওয়ে বোর্ডের পরিকাঠামো বিভাগের প্রাক্তন সদস্য প্রদীপ কুমার নিউজ ১৮ তামিলকে এই প্রক্রিয়াটি কীভাবে কাজ করে তা ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, প্রতিটি সিগন্যালের একটি নির্দিষ্ট নম্বর এবং রঙ থাকে। উদাহরণস্বরূপ, যদি সামনের সিগন্যালের নম্বর ১০৫০ হয় এবং সেটি সবুজ দেখায়, তাহলে লোকো পাইলট জোরে বলে ওঠেন “সিগন্যাল ১০৫০, সবুজ”, আর অ্যাসিস্ট্যান্ট লোকো পাইলট সঙ্গে সঙ্গে সেটি দেখে যাচাই করে নিশ্চিত করেন।
রাতে ট্রেনে চলার সময় জানালার পাশ দিয়ে যে সিগন্যাল বা সংকেতগুলো চোখে পড়ে, সেগুলো একেবারেই এলোমেলোভাবে বসানো নয়। খোলা রেলপথে সাধারণত প্রতি ১ থেকে ২ কিলোমিটার পর পর সিগন্যাল থাকে, যাতে দূর থেকে ট্রেনের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আবার ব্যস্ত রেল করিডোরে এই দূরত্ব আরও কমে আসে, সেখানে প্রায় ৫০০ থেকে ৮০০ মিটার পর পর সিগন্যাল দেখা যায়। আর বড় স্টেশন বা জংশনের কাছাকাছি, যেমন চেন্নাই সেন্ট্রালের মতো জায়গায়, নিরাপত্তা আরও বেশি নিশ্চিত করতে প্রতি ২০০ থেকে ৫০০ মিটার অন্তর সিগন্যাল বসানো থাকে। এই ধারাবাহিক ব্যবস্থা লোকো পাইলটকে সামনে ট্র্যাকের অবস্থা সম্পর্কে ক্রমাগত আপডেট দেয়, যাতে যাত্রা সবসময় নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত থাকে।
