মাছ হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারী চর্বিহীন প্রোটিনের একটি ভালো উৎস। সপ্তাহে এক থেকে দুইবার প্রোটিনের উৎস হিসেবে মাছ খেলে হৃদ্রোগ ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। মাছের মধ্যে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড শরীরে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমাতে, প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী ভূমিকা পালন করে। তবে মাছ কীভাবে রান্না করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ—অতিরিক্ত তেল বা ভাজাভুজির পরিবর্তে কম তেলে রান্না করা বা গ্রিল করা মাছ তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যকর।
মাছ খেলে কী কী স্বাস্থ্য উপকার পাওয়া যায়?
মাছ থেকে পাওয়া লং-চেইন ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, বিশেষ করে EPA ও DHA, শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। তবে তাই বলে সব ধরনের মাছ নিয়মিত খাওয়া একেবারে ঝুঁকিমুক্ত নয়। কিছু প্রজাতির মাছে তুলনামূলক বেশি মাত্রায় পারদ থাকতে পারে, যা অতিরিক্ত পরিমাণে শরীরে জমলে স্নায়ুতন্ত্রের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। জলদূষণের কারণে সমুদ্র, হ্রদ ও নদীর বাস্তুতন্ত্রে পারদ ছড়িয়ে পড়ে এবং মাছের শরীরে তা জমতে পারে। মাছ খাওয়ার পর শরীরে এই পারদ মিথাইলমারকারিতে রূপান্তরিত হয়, যা একটি বিষাক্ত যৌগ হিসেবে পরিচিত। তাই মাছের উপকারিতা পাওয়ার পাশাপাশি কোন ধরনের মাছ কতটা পরিমাণে খাওয়া হচ্ছে, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন পুষ্টিবিদ পূজা মালহোত্রা।
মাছে থাকা ওমেগা-৩ কেন শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
খাদ্যশৃঙ্খলের একেবারে উপরের স্তরে থাকা বড় মাছ সাধারণত ছোট ছোট মাছ খেয়ে বেঁচে থাকে। ফলে তাদের শরীরে পারদ ও অন্যান্য দূষকের মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি জমতে পারে। এই কারণে তুলনামূলকভাবে ছোট ও কম পারদযুক্ত মাছ বেছে নেওয়াকে অনেক সময় নিরাপদ বিকল্প হিসেবে ধরা হয়। অন্যদিকে, খামারে চাষ করা মাছের ক্ষেত্রে মাছের খাদ্য, চাষের পরিবেশ এবং অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের বিষয়টিও বিবেচনা করা জরুরি। তাই মাছ বাছাই করার সময় প্রজাতি, উৎস এবং চাষের পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন থাকা উচিত।
মাছের পারদ স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর?
মাছের পারদ নিয়ে সবচেয়ে বেশি সতর্কতা প্রয়োজন শিশু ও ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে, কারণ তাদের বিকাশমান স্নায়ুতন্ত্র পারদের ক্ষতিকর প্রভাবের প্রতি বেশি সংবেদনশীল। একই কারণে গর্ভবতী ও স্তন্যদায়ী মহিলাদের মাছ বেছে নেওয়ার সময় বিশেষভাবে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। অতিরিক্ত মাত্রায় মিথাইলমারকারির সংস্পর্শে এলে প্রাপ্তবয়স্কদেরও কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যদিও সাধারণ পরিমাণে মাছ খেলে এমন ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। শুধু পারদ নয়, কিছু মাছে PCB (Polychlorinated Biphenyls)-এর মতো পরিবেশদূষকও থাকতে পারে। তাই বেশি পারদযুক্ত মাছ নিয়মিত না খাওয়াই ভালো এবং শিশু ও গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে নিরাপদ, কম পারদযুক্ত মাছ বেছে নেওয়া উচিত।
ব্লুফিশ খাওয়া কতটা নিরাপদ?
ব্লুফিশে সেলেনিয়াম, নিয়াসিন, ভিটামিন B12 এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের পাশাপাশি ম্যাগনেসিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান রয়েছে। তবে পারদ, PCB, ডাইঅক্সিনসহ বিভিন্ন পরিবেশদূষকের উপস্থিতির কারণে এই মাছ খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। বিশেষ করে গর্ভবতী ও স্তন্যদায়ী নারী, গর্ভধারণের সম্ভাবনা রয়েছে এমন নারী এবং ৮ বছরের কম বয়সি শিশুদের ব্লুফিশ ও স্ট্রাইপড বাস এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। অন্যদের ক্ষেত্রেও এই মাছ অতিরিক্ত না খেয়ে বছরে চারবারের বেশি না খাওয়াই নিরাপদ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
গ্রুপার মাছে পারদের ঝুঁকি কতটা?
গ্রুপার এক ধরনের শিকারি মাছ, যা রান্না করলে হালকা ও সামান্য মিষ্টি স্বাদের হয়। এর মাংসের গঠন এমন যে একটু বেশি রান্না হয়ে গেলেও স্বাদ ও টেক্সচার ভালো থাকে। এই মাছে ভিটামিন A, B ও D-এর পাশাপাশি ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, প্রোটিন, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন ও পটাশিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। তবে শিকারি মাছ হওয়ায় গ্রুপারের শরীরে পারদ ও অন্যান্য ভারী ধাতু তুলনামূলক বেশি জমতে পারে। তাই পুষ্টিগুণ থাকলেও এই মাছ নিয়মিত বা অতিরিক্ত পরিমাণে না খেয়ে পরিমিতভাবে খাওয়াই ভালো।
বাস বা ভেটকি মাছ খাওয়ার উপকারিতা ও সতর্কতা
বাস মাছ কম-ক্যালোরিযুক্ত এবং উন্নতমানের প্রোটিনের একটি ভালো উৎস। এতে থাকা প্রোটিন পেশি গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণে সাহায্য করার পাশাপাশি দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে পারে, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। একইসঙ্গে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ বাস মাছ নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে খেলে হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী হতে পারে। এটি রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে এবং ক্ষতিকর LDL কোলেস্টেরল বাড়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে বাস মাছে পারদের মাত্রা তুলনামূলক বেশি হতে পারে বলে গর্ভবতী নারী, স্তন্যদানকারী মা ও শিশুদের ক্ষেত্রে এই মাছ খাওয়ার পরিমাণ নিয়ে সতর্ক থাকা উচিত। এছাড়া এতে পটাশিয়াম থাকায় কিডনির সমস্যা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের বাস বা ভেটকি মাছ নিয়মিত খাওয়ার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
হাঙরের মাংস খাওয়া কি নিরাপদ?
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন দেশে হাঙরের মাংস খাওয়ার প্রচলন থাকলেও এটি খাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। হাঙর খাদ্যশৃঙ্খলের একেবারে উপরের দিকে থাকা শিকারি মাছ হওয়ায় তাদের শরীরে পারদসহ বিভিন্ন ভারী ধাতু ও পরিবেশদূষক জমতে পারে। অতিরিক্ত পারদের সংস্পর্শে স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা এবং শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার মতো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের জন্য উচ্চ পারদযুক্ত হাঙরের মাংস এড়িয়ে চলা বা নিরাপদ বিকল্প মাছ বেছে নেওয়াই ভালো।
সোর্ডফিশে পারদের মাত্রা বেশি কেন?
সোর্ডফিশ এমন একটি মাছ, যার শরীরে পারদের মাত্রা তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত বেশি থাকতে পারে। নিয়মিত বা অতিরিক্ত পরিমাণে উচ্চ পারদযুক্ত মাছ খেলে শরীরে পারদ জমার ঝুঁকি বাড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের বিকাশমান মস্তিষ্ক পারদের প্রতি বেশি সংবেদনশীল। তাই শিশু, গর্ভবতী নারী এবং স্তন্যদানকারী মায়েদের সোর্ডফিশ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও উচ্চ পারদযুক্ত মাছ নিয়মিত না খেয়ে তুলনামূলক কম পারদযুক্ত মাছ বেছে নেওয়া নিরাপদ।
টুনা মাছে পারদ কতটা থাকে?
টুনা মাছে পারদের মাত্রা তুলনামূলক বেশি হতে পারে, তাই এটি খাওয়ার ক্ষেত্রে পরিমাণের দিকে নজর রাখা জরুরি। সমুদ্রের খাদ্যশৃঙ্খল থেকে টুনা মাছ মিথাইলমারকারি শোষণ করে এবং বড় আকারের টুনা সাধারণত বেশি সময় ধরে এই দূষকের সংস্পর্শে থাকায় ‘অ্যালবাকোর’ ও ‘ইয়েলোফিন’-এর মতো প্রজাতিতে পারদের মাত্রা ‘স্কিপজ্যাক লাইট টুনা’-র তুলনায় বেশি হতে পারে। অতিরিক্ত পারদের সংস্পর্শে স্নায়ুতন্ত্রের উপর প্রভাব পড়তে পারে এবং বমি বমি ভাব, বমি, মনোযোগের সমস্যা ও অন্যান্য শারীরিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে পরিমিত পরিমাণে কম পারদযুক্ত টুনা সাধারণত খাদ্যতালিকায় রাখা যায়। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে কম পারদযুক্ত টুনা বেছে নেওয়া এবং নির্ধারিত পরিমাণের বেশি না খাওয়াই ভালো।
