মটোরোলার স্মার্টফোনগুলোর মধ্যে পার্থক্য করা এখন দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। ৭০,০০০ টাকার ফ্ল্যাগশিপ মডেল হোক কিংবা ২৫,৯৯৯ টাকার মিড-রেঞ্জ ফোন—যে মডেলই হাতে নিন না কেন, প্রথমেই চোখে পড়বে মটোরোলার পরিচিত ডিজাইন। Lenovo-র মালিকানাধীন এই সংস্থাটি বেশ কিছুদিন ধরেই তাদের বিভিন্ন স্মার্টফোনে একই ধরনের ডিজাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করে আসছে, আর নতুন Moto G77 Power-ও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে শুধু ডিজাইন দিয়ে বিচার করলে চলবে না, কারণ ফিচারের দিক থেকে ফোনটিতে বেশ কিছু আকর্ষণীয় বিষয় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিশাল ৭,০০০mAh ব্যাটারি, ১২০Hz রিফ্রেশ রেটের ডিসপ্লে, ক্লিন Android অভিজ্ঞতা এবং উন্নতমানের ৫০MP প্রাইমারি ক্যামেরা।
Moto G77 Power Review
Moto G77 Power-এর ডিজাইন ও ডিসপ্লে
Moto G77 Power-এর মাপ ১৬৬.২৩ × ৭৬.৫০ × ৮.৮৯ মিমি এবং ওজন ২১৫ গ্রাম। ফোনটি Pantone Fuchsia Red, Pantone Impenetrable এবং Pantone Nautical Blue—এই তিনটি রঙে পাওয়া যায়। জল ও ধুলোর হাত থেকে সুরক্ষার জন্য এতে IP64 রেটিং রয়েছে। তবে ডিজাইনের ক্ষেত্রে Moto G77 Power-এ খুব একটা নতুনত্ব দেখা যায় না। মটোরোলা তাদের সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি স্মার্টফোনে যে পরিচিত ডিজাইন ব্যবহার করে আসছে, এই ফোনেও মূলত সেই একই নকশা ধরে রাখা হয়েছে। ফলে প্রথম দেখায় মটোরোলার ফ্ল্যাগশিপ কিংবা অন্যান্য মডেলের থেকে Moto G77 Power-কে আলাদা করে চেনা কিছুটা কঠিন হতে পারে।
তবে ডিজাইনে খুব বেশি নতুনত্ব না থাকলেও Moto G77 Power-এর বিল্ড কোয়ালিটি মোটেও খারাপ নয়। ফোনটি হাতে ধরলে যথেষ্ট মজবুত মনে হয় এবং পিছনে ভেগান লেদারের ফিনিশ থাকায় গ্রিপও বেশ ভালো। যদিও এতে খুব একটা প্রিমিয়াম লুক নেই, তবুও ফোনটি হাতে ধরে ব্যবহার করতে আরামদায়ক এবং চকচকে কাচের ব্যাক প্যানেলের মতো সহজে আঙুলের ছাপও পড়ে না। আমাদের কাছে থাকা Pantone Nautical Blue রঙের মডেলটিও বেশ ভারসাম্যপূর্ণ—না অতিরিক্ত চড়া, না আবার একেবারে সাধারণ। তবে ফোনটির প্রায় ২১৫ গ্রাম ওজন কিছুটা বেশি মনে হতে পারে। অন্যদিকে, স্থায়িত্বের দিক থেকে এতে IP64 রেটিংয়ের পাশাপাশি MIL-STD-810H সার্টিফিকেশন রয়েছে, যা ফোনটিকে ধুলো ও পানির মতো দৈনন্দিন পরিস্থিতিতে বাড়তি সুরক্ষা দেয়। এছাড়া ৩.৫ মিমি হেডফোন জ্যাক থাকাটাও নিঃসন্দেহে ভালো সংযোজন, বিশেষ করে যারা এখনও তারযুক্ত ইয়ারফোন ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
Motorola G77 Power-এ ১২০Hz রিফ্রেশ রেটের ৬.৭২ ইঞ্চির Full HD+ LCD ডিসপ্লে ব্যবহার করা হয়েছে। ইতিবাচক দিক থেকে শুরু করলে, স্ক্রিনের রেজোলিউশন যথেষ্ট ভালো এবং লেখা ও UI এলিমেন্টগুলো পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। ওয়েব ব্রাউজিং, সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করা কিংবা YouTube ভিডিও দেখার সময় ডিসপ্লে নিয়ে বড় কোনো সমস্যা হয় না, আর ১২০Hz রিফ্রেশ রেটের কারণে স্ক্রলিংও বেশ মসৃণ লাগে। তবে প্যানেলের মান খুব একটা অসাধারণ নয়। একই সংস্থার Motorola Edge 70 Fusion-এর মতো মিড-রেঞ্জ ফোনে যেখানে উন্নত AMOLED ডিসপ্লে পাওয়া যায়, সেখানে G77 Power-এর LCD প্যানেলে কালো রঙের গভীরতা ও কনট্রাস্ট তুলনামূলকভাবে কম। ফলে Netflix বা Crunchyroll-এর মতো প্ল্যাটফর্মে দীর্ঘ সময় সিনেমা, সিরিজ কিংবা অ্যানিমে দেখার অভিজ্ঞতা কিছুটা পিছিয়ে থাকে। এছাড়া পাশ থেকে বা অন্য কোনো কোণ থেকে স্ক্রিন দেখলে রঙে সামান্য পরিবর্তন দেখা যায়, যার ফলে পাশে বসা ব্যক্তির জন্য ডিসপ্লের ভিউয়িং এক্সপেরিয়েন্স খুব একটা ভালো নাও হতে পারে।
উজ্জ্বলতার দিক থেকে Moto G77 Power-এর ডিসপ্লে মোটামুটি ভালো। মেঘলা আবহাওয়ায় বাইরে ফোন ব্যবহার করতে কোনো বড় সমস্যা হয় না এবং স্ক্রিন যথেষ্ট উজ্জ্বল থাকে। তবে রোদেলা দিনে সরাসরি বাইরে ব্যবহার করলে অভিজ্ঞতা ততটা ভালো নয়, কারণ সেই পরিস্থিতিতে ডিসপ্লের আউটডোর ভিজিবিলিটি গড়পড়তা। অন্যদিকে, ফোনটিতে স্টেরিও স্পিকার দেওয়াটা অবশ্যই ভালো সংযোজন। স্পিকার দু’টি দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট ভালো কাজ করে এবং শব্দও পরিষ্কারভাবে শোনা যায়। তবে বেসের ঘাটতি রয়েছে, যদিও এই দামের সেগমেন্টের বেশিরভাগ স্মার্টফোনেই এমনটা দেখা যায়।
Moto G77 Power-এর পারফরম্যান্স ও সফটওয়্যার
Moto G77 Power-এ পারফরম্যান্সের জন্য ৬nm প্রসেসে তৈরি MediaTek Dimensity 6400 চিপসেট ব্যবহার করা হয়েছে। ফোনটিতে রয়েছে ৮GB LPDDR4x RAM এবং ১২৮GB UFS 2.2 স্টোরেজ। সফটওয়্যারের দিক থেকে এটি Android 16 অপারেটিং সিস্টেমে চলে এবং Motorola ফোনটির জন্য ১ বছরের OS আপডেট ও ৩ বছরের SMR বা সিকিউরিটি মেইনটেন্যান্স রিলিজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এই ফোনের প্রসেসর নিয়ে কিছুটা প্রশ্ন উঠতেই পারে, কারণ কম দামের Moto G37 Power-এও একই Dimensity 6400 চিপসেট ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে প্রায় ১০,০০০ টাকা বেশি দামের G77 Power-এ একই প্রসেসর দেওয়ার সিদ্ধান্তটি কিছুটা অদ্ভুত বলেই মনে হতে পারে।
দৈনন্দিন ব্যবহারে Moto G77 Power-এর পারফরম্যান্স বেশ ভালোই। সোশ্যাল মিডিয়া, মেসেজিং, Chrome, Instagram-এর মতো সাধারণ অ্যাপ ব্যবহার করা কিংবা একাধিক অ্যাপের মধ্যে দ্রুত অদলবদল করার সময় ফোনটি কোনো বড় সমস্যা তৈরি করে না। তবে ভারী কাজ বা গেমিংয়ের সময় এর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে যায়। Balanced গ্রাফিক্স সেটিংসে BGMI মোটামুটি ভালোভাবেই খেলা যায়, কিন্তু গ্রাফিক্সের মান বাড়ালেই দ্রুত ফ্রেম ড্রপ দেখা যায়। Call of Duty: Mobile-এর ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। দীর্ঘ সময় গেম খেললে ফোনটি কিছুটা গরম হয়, যদিও তা খুব বেশি অস্বস্তিকর পর্যায়ে পৌঁছায় না। সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে Moto G77 Power Android 16-এর সঙ্গে Motorola-র Hello UI ব্যবহার করে। মটোরোলার ফোনে যেমন পরিচ্ছন্ন সফটওয়্যার অভিজ্ঞতা আশা করা যায়, এখানেও তেমনটাই পাওয়া যায়—অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ বা ব্লোটওয়্যার খুব কম এবং সামগ্রিক পারফরম্যান্সও বেশ মসৃণ। ব্যবহারের সময় বড় কোনো সফটওয়্যার সমস্যা চোখে পড়েনি।
তবে সফটওয়্যার আপডেটের ক্ষেত্রে Moto G77 Power খুব একটা সন্তোষজনক নয়। Motorola এই ফোনের জন্য মাত্র একটি বড় Android আপডেট, অর্থাৎ Android 17 পর্যন্ত আপডেট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা সম্ভবত চলতি বছর অথবা ২০২৭ সালের শুরুতে পাওয়া যেতে পারে। ফলে কয়েক মাস পর ফোনটি কিনলেও দীর্ঘমেয়াদে বড় কোনো সফটওয়্যার আপগ্রেড পাওয়ার সম্ভাবনা কম। এই দামের সেগমেন্টে বিষয়টি কিছুটা হতাশাজনক, বিশেষ করে Samsung ও OnePlus-এর মতো প্রতিদ্বন্দ্বী ব্র্যান্ডগুলো যেখানে তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় ধরে সফটওয়্যার আপডেট ও সিকিউরিটি সাপোর্ট দিয়ে থাকে।
Moto G77 Power Cameras
Moto G77 Power-এর পিছনে ডুয়াল ক্যামেরা সেটআপ রয়েছে, যার মধ্যে f/1.8 অ্যাপারচারের ৫০MP প্রাইমারি ক্যামেরা এবং f/2.2 অ্যাপারচারের ৮MP আলট্রা-ওয়াইড-অ্যাঙ্গেল ক্যামেরা রয়েছে। সেলফি ও ভিডিও কলের জন্য সামনে দেওয়া হয়েছে f/2.2 অ্যাপারচারের ৩২MP ফ্রন্ট ক্যামেরা। ফলে সাধারণ ফটোগ্রাফির পাশাপাশি বেশি পরিসরের দৃশ্য ক্যাপচার করার ক্ষেত্রেও ফোনটির আলট্রা-ওয়াইড ক্যামেরা কাজে আসতে পারে।
দিনের আলোতে Moto G77 Power-এর ৫০MP প্রাইমারি ক্যামেরা বেশ ভালো ডাইনামিক রেঞ্জসহ সন্তোষজনক ছবি তুলতে পারে। তবে ছবির রঙে কিছুটা উষ্ণ টোন দেখা যায় এবং মাঝে মাঝে কালার একটু বেশি উজ্জ্বল বা গাঢ় মনে হতে পারে। প্রথম দেখায় ছবিতে যথেষ্ট ডিটেইল রয়েছে বলে মনে হলেও জুম করে দেখলে সূক্ষ্ম খুঁটিনাটি কিছুটা নষ্ট হয়ে যায়। কম আলোতে পারফরম্যান্স আরও কিছুটা সীমিত, কারণ Motorola এই ফোনে OIS বা অপটিক্যাল ইমেজ স্ট্যাবিলাইজেশন দেয়নি। ফলে রাতে বা খুব কম আলোতে ছবি তোলার সময় হাত স্থির রাখা জরুরি, তবুও ছবিতে কিছুটা নয়েজ ও দানাদার ভাব দেখা যেতে পারে।
অন্যদিকে, ৮MP আলট্রা-ওয়াইড ক্যামেরার পারফরম্যান্স খুব একটা впечатশালী নয়। এটি মূল ক্যামেরার মতোই ভালো ডাইনামিক রেঞ্জ দেওয়ার চেষ্টা করে ঠিকই, তবে ছবির ডিটেইল তুলনামূলকভাবে নরম বা সফট দেখায়। তবে ৩২MP ফ্রন্ট ক্যামেরার পারফরম্যান্স বেশ ভালো। সেলফিতে পর্যাপ্ত ডিটেইল পাওয়া যায় এবং ছবিগুলো অতিরিক্ত প্রসেসডও মনে হয় না। পাশাপাশি ছবিতে রঙ বেশ স্বাভাবিক থাকে এবং ডাইনামিক রেঞ্জও সন্তোষজনক, ফলে দিনের আলোতে সেলফি তোলার জন্য ক্যামেরাটি ভালো কাজ করে।
Moto G77 Power Battery Life
ব্যাটারি পারফরম্যান্সের দিক থেকে Moto G77 Power নিঃসন্দেহে ফোনটির অন্যতম শক্তিশালী দিক। এতে রয়েছে বিশাল ৭,০০০mAh ব্যাটারি, যা একটানা ভিডিও দেখা, গান শোনা, ভিডিও কল, সোশ্যাল মিডিয়া ব্রাউজিং এবং মেসেজিংয়ের মতো নিয়মিত কাজ করেও প্রায় দেড় দিন পর্যন্ত ব্যাকআপ দিতে পারে। আর ব্যবহার তুলনামূলকভাবে হালকা হলে ব্যাটারি লাইফ দুই দিন পর্যন্তও পৌঁছাতে পারে। ফোনটির সঙ্গে বক্সেই চার্জার পাওয়া যায় এবং এতে ৩০W তারযুক্ত ফাস্ট চার্জিং সাপোর্ট রয়েছে। ফলে বড় ব্যাটারির কারণে দীর্ঘ সময় ফোন ব্যবহার করতে চাইলে Moto G77 Power বেশ আকর্ষণীয় একটি বিকল্প হতে পারে।
