মুড়ি নেই, তবু নাম তার মুড়িঘণ্ট! বাঙালি রান্নার এমন মজার নামের পেছনেও রয়েছে দারুণ ইতিহাস। একসময় বাড়িতে অতিথি এলেই কড়াইয়ে মুড়িঘণ্ট বসত, আর মাছের মাথা ও আতপচালের এই অপূর্ব যুগলবন্দি ছিল একেবারে ঘরোয়া ভোজের অন্যতম আকর্ষণ। সময়ের সঙ্গে ব্যস্ততা বাড়ায় এই ঐতিহ্যবাহী পদ রান্নার চল কিছুটা কমেছে ঠিকই, তবে স্বাদ ও জনপ্রিয়তা এখনও অটুট। কেন এই পদের নাম মুড়িঘণ্ট হল, তার কারণ জানার পাশাপাশি আজ জেনে নিন খুব সহজে বাড়িতে মুড়িঘণ্ট রান্নার রেসিপি। সময় কম হলেও আর আফসোস নয়, সামান্য কিছু উপকরণেই আপনিও তৈরি করতে পারবেন বাঙালির এই পুরনো দিনের প্রিয় পদ।
মুড়িঘণ্ট নাম হল কেন? জানুন এই পদের আসল ইতিহাস
এই পদের নাম ‘মুড়িঘণ্ট’ হলেও এর সঙ্গে মুড়ি বা চালের কোনও সরাসরি সম্পর্ক নেই। আসলে ‘মুড়ি’ শব্দটি এসেছে ‘মুড়ো’ থেকে। মাছের মুড়ো ছাড়া এই পদ তৈরি হয় না বলেই নাম হয়েছে ‘মুড়োর ঘণ্ট’ বা সংক্ষেপে ‘মুড়িঘণ্ট’। মূলত বাঙাল বাড়ির জনপ্রিয় এই পদ বড় ও পাকা রুই বা কাতলা মাছের মুড়ো দিয়ে রান্না করা হয়। তবে জানলে অবাক হবেন, মুড়িঘণ্টের শুরু কিন্তু কোনও বনেদি বাড়ির রান্নাঘর থেকে নয়। কথিত আছে, একসময় দীর্ঘ জলযাত্রায় নৌকার মাঝিমাল্লাদের খাবারের অন্যতম ভরসা ছিল নদী থেকে ধরা টাটকা মাছ। মাছের ঝোল রান্না করার পর বেঁচে যেত মুড়ো ও ল্যাজা। সেগুলি ফেলে না দিয়ে কীভাবে সুস্বাদু করে খাওয়া যায়, সেই ভাবনা থেকেই তৈরি হয় এই পদ। ধীরে ধীরে মাঝিমাল্লাদের উনুন থেকে মুড়িঘণ্ট জায়গা করে নেয় বাঙালির ঘরোয়া রান্নাঘরে এবং একসময় ভোজনরসিকদের কাছে হয়ে ওঠে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি পদ।
মুড়িঘণ্ট রান্নার জন্য কী কী উপকরণ লাগবে?
মুড়িঘণ্ট রান্নার জন্য প্রথমেই প্রায় ৫০০–৫৫০ গ্রাম ওজনের রুই বা কাতলা মাছের মুড়ো নিন। চাইলে কানকো রেখে কিংবা বাদ দিয়েও এই পদ রান্না করতে পারেন। তবে কানকো রাখতে হলে পরিষ্কার করার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। প্রথমে কলের জলের নিচে ভালো করে মাছের মাথা ধুয়ে নিন, যতক্ষণ না লালচে কানকো সাদা ও ফ্যাকাসে হয়ে যায়। এরপর কানকোর সঙ্গে লেগে থাকা সাদা অংশটি অবশ্যই ফেলে দিন। কারণ এই অংশে অনেক সময় নোংরা, শ্যাওলা কিংবা ছোটখাটো আগাছার টুকরো লেগে থাকতে পারে। ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিলে মুড়িঘণ্টের স্বাদ যেমন ভালো হবে, তেমনই রান্নাটিও হবে আরও স্বাস্থ্যসম্মত।
মাছের মুড়ো পরিষ্কার করার সঠিক পদ্ধতি
এরপর মাছের মুড়োতে পরিমাণমতো নুন ও হলুদ ভালো করে মাখিয়ে অন্তত আধঘণ্টা রেখে দিন। এই সময়ের মধ্যে চাল প্রস্তুত করে নিতে হবে। প্রায় ৩০০ গ্রাম গোবিন্দভোগ চাল কয়েকবার জল বদলে ভালোভাবে ধুয়ে নিন। এরপর পরিষ্কার কাপড়ের উপর ছড়িয়ে রেখে চালটি ভালোভাবে শুকিয়ে নিন। তবে গোবিন্দভোগ না থাকলেও সমস্যা নেই। এই রান্নায় রাধাতিলক, তুলাইপাঞ্জি, চিনিগুঁড়া কিংবা কালিজিরা চালও ব্যবহার করা যেতে পারে। সুগন্ধি ও ঝরঝরে চাল ব্যবহার করলে মুড়িঘণ্টের স্বাদ আরও ভালো হয়।
কড়াইয়ে সমপরিমাণ সর্ষের তেল ও ঘি দিয়ে প্রথমে কাজুবাদাম ও কিশমিশ হালকা করে ভেজে তুলে রাখুন। এরপর ওই কড়াইতেই ধুয়ে শুকিয়ে রাখা চাল দিয়ে প্রায় ১০ মিনিট ভালোভাবে ভেজে নিন। চালের গন্ধ বেরিয়ে এলে সেটিও তুলে আলাদা করে রাখুন। এবার কড়াইয়ে সর্ষের তেল দিয়ে নুন মাখানো ডুমো ডুমো করে কাটা আলুগুলি ভেজে নিন। আলু ভালোভাবে ভাজা হয়ে গেলে তুলে রাখুন এবং ওই তেলেই মাছের মুড়ো দিয়ে প্রায় ১০ মিনিট ধরে ভাজুন। মুড়োর গায়ে সুন্দর কড়া বাদামি রং ধরলে বুঝবেন তা ভালোভাবে ভাজা হয়েছে। শীতকালে চাইলে এই রান্নায় মটরশুঁটি ও ফুলকপিও যোগ করতে পারেন, এতে মুড়িঘণ্টের স্বাদ আরও জমে উঠবে।
আলু ও মাছের মুড়ো ভালোভাবে ভেজে নিন
মাছের মাথা ভাজার সময় খুন্তির সাহায্যে সেটিকে কয়েকটি টুকরো করে নিন। ভালোভাবে ভাজা হয়ে গেলে মুড়োগুলি তুলে আলাদা করে রাখুন। এবার ওই তেলেই সামান্য ঘি দিয়ে শুকনো লঙ্কা ও তেজপাতা ফোড়ন দিন। এরপর গোটা দারচিনি, লবঙ্গ, ছোট এলাচ এবং গোটা জিরে দিয়ে সুগন্ধ বের হওয়া পর্যন্ত ভেজে নিন। এবার হলুদ, জিরেগুঁড়ো, ধনেগুঁড়ো ও লঙ্কাগুঁড়ো দিয়ে মশলা কষতে থাকুন, তবে খেয়াল রাখবেন যেন মশলা পুড়ে না যায়। এরপর আদাবাটা ও গোটা গরমমশলা দিয়ে আরও প্রায় ২ মিনিট কষিয়ে নিন। মশলা ভালোভাবে কষানো হলে তার মধ্যে ভাজা মাছের মাথা দিয়ে ৫ মিনিট ঢেকে রান্না করুন এবং মাঝে মাঝে হালকা করে নেড়ে দিন। এরপর একে একে ভেজে রাখা কাজুবাদাম-কিশমিশ মেশানো চাল ও ভাজা আলু দিয়ে দিন। সঙ্গে ৩–৪টি চেরা কাঁচালঙ্কা দিয়ে সবকিছু ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। সবশেষে ৮০০ মিলিলিটার উষ্ণ জল ঢেলে আবার ভালো করে মিশিয়ে কড়াই ঢেকে একেবারে কম আঁচে প্রায় ১০ মিনিট রান্না করুন।
সহজ পদ্ধতিতে বাড়িতেই তৈরি করুন সুস্বাদু মুড়িঘণ্ট
মুড়িঘণ্ট নামানোর ঠিক আগে এতে প্রায় ৩০ গ্রাম চিনি দিয়ে দিন। তবে চিনি খুব আগে দিয়ে দিলে চাল ভালোভাবে সিদ্ধ হতে সমস্যা হতে পারে, তাই রান্নার শেষ পর্যায়েই চিনি দেওয়াই ভালো। সব উপকরণ একসঙ্গে দেওয়ার পর খুন্তির সাহায্যে খুব আলতোভাবে নাড়তে থাকুন, যাতে চাল ভেঙে না যায়। এরপর আবার কড়াই ঢেকে একেবারে ঢিমে আঁচে প্রায় ৫ মিনিট রান্না করুন। তারপর ঢাকনা খুলে দেখে নিন চাল ভালোভাবে সিদ্ধ হয়েছে কি না। সবশেষে উপর থেকে সামান্য গরমমশলার গুঁড়ো ও ঘি ছড়িয়ে দিয়ে আরও একবার মিশিয়ে নিন। সুগন্ধ বেরিয়ে এলে গরম গরম নামিয়ে পরিবেশন করুন বাঙালির ঐতিহ্যবাহী মুড়িঘণ্ট।
