রাজা রামমোহন রায় (Ram Mohan Roy) ছিলেন ভারতীয় নবজাগরণের অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ এবং আধুনিক ভারতের শ্রেষ্ঠ সমাজসংস্কারকদের একজন। সমাজের কুসংস্কার দূর করা, নারীশিক্ষার প্রসার, সতীদাহ প্রথা বিলোপ এবং যুক্তিবাদী চিন্তার বিকাশে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়। তাঁর প্রগতিশীল ভাবনা ও আদর্শ পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের বহু নেতাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। অসাধারণ প্রতিভা, পাণ্ডিত্য, দূরদর্শিতা এবং সমাজকল্যাণে নিরলস কাজের জন্য রাজা রামমোহন রায়কে আধুনিক ভারতের নবজাগরণের অগ্রদূত এবং জাতির অন্যতম মহান মনীষী হিসেবে সম্মান করা হয়।
ভারতের নব যুগের প্রবর্তক রাজা রামমোহন রায়ের একটি সংক্ষিপ্ত জীবনী। রাজা রামমোহন রায় জীবনী বা জীবন কথা নিয়ে বা জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো । A short biography of Ram Mohan Roy. Ram Mohan Roy’s Birthday, Parents, Education Life, Work Life, The practice of satidah, ‘Raja’ Title, Books, Biography (Jivani) in Bengali.
রাজা রামমোহন রায় কে ছিলেন ? Who is Ram Mohan Roy ?
রাজা রামমোহন রায় (Ram Mohan Roy) ছিলেন আধুনিক ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমাজসংস্কারক, দার্শনিক এবং ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতা। সমাজে প্রচলিত নানা কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তিনি সাহসিকতার সঙ্গে আন্দোলন করেছিলেন। রাজনীতি, শিক্ষা, জনপ্রশাসন এবং ধর্মীয় সংস্কারের ক্ষেত্রেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তবে তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত সতীদাহ প্রথা বিলোপের আন্দোলনের জন্য। সেই সময় বহু হিন্দু বিধবা নারীকে স্বামীর মৃত্যুর পর জোরপূর্বক তাঁর চিতায় আত্মাহুতি দিতে বাধ্য করা হতো। এই অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে রামমোহন রায় দৃঢ় অবস্থান নেন এবং তাঁর নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই সতীদাহ প্রথা বিলোপের পথ সুগম হয়। আজও মানবতা, নারী অধিকার এবং সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
ভারতের নব যুগের প্রবর্তক রাজা রামমোহন রায়ের জীবনী – Ram Mohan Roy Biography in Bengali :
| নাম (Name) | রাজা রামমোহন রায় (Ram Mohan Roy) |
| জন্ম (Birthday) | ২২ মে, ১৭৭২ (22 May 1772) |
| জন্মস্থান (Birthplace) | রাধানগর, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত |
| অভিভাবক (Parents)/ পিতামাতা | রমকান্ত রায় (বাবা)তারিণী দেবী (মা) |
| জাতীয়তা | ভারতীয় |
| পেশা (Occupation) | সামাজিক-ধর্মীয় সংস্কারক |
| শিক্ষা | কলকাতা পাটনা |
| আন্দোলন | বাংলার নজাগরণ |
| প্রধান সংগঠন | ব্রহ্ম সমাজ |
| মৃত্যু (Death) | সেপ্টেম্বর ২৭, ১৮৩৩ (27 September 1833) |
রামমোহন রায়ের শিক্ষাজীবন
ছোটবেলা থেকেই রাজা রামমোহন রায়ের পড়াশোনার প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। মাত্র আট বছর বয়সে তিনি গ্রামের পাঠশালায় বাংলা ও আরবি ভাষার শিক্ষা শুরু করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য পাটনায় গিয়ে আরবি ও ফারসি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। পরে প্রায় বারো বছর বয়সে সংস্কৃত শিক্ষা ও শাস্ত্র অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে কাশীতে যান। সেখানে কয়েক বছর ধরে সংস্কৃত ব্যাকরণ, দর্শন এবং বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ নিয়ে পড়াশোনা করেন। পাশাপাশি বেদান্ত দর্শনের উপরও গভীর গবেষণা করে তিনি নিজেকে একজন বহুভাষাবিদ ও প্রাজ্ঞ পণ্ডিত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
রামমােহন হিন্দুধর্মের সাকার উপাসনা পদ্ধতির বিরােধী
কৈশোর থেকেই রাজা রামমোহন রায় যুক্তিবাদী চিন্তাধারার প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। তিনি হিন্দুধর্মে প্রচলিত মূর্তিপূজার বিরোধিতা করতেন এবং একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। এই বিষয়গুলি নিয়ে তিনি বিভিন্ন প্রবন্ধ ও গ্রন্থ রচনা করেন, যার ফলে তাঁর মতাদর্শ পরিবার ও সমাজের একাংশের বিরোধিতার মুখে পড়ে। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, মতপার্থক্যের কারণে তিনি একসময় বাড়ি ছেড়ে তিব্বতে ভ্রমণ করেন এবং কয়েক বছর পর ভারতে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে তিনি ইংরেজি ভাষাসহ বিভিন্ন বিষয় অধ্যয়ন চালিয়ে যান। অল্প বয়সেই তিনি বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, উর্দু, গ্রিক, হিব্রু ও ল্যাটিনসহ একাধিক ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন।
রামমোহন রায়ের কর্মজীবন
শিক্ষাজীবন শেষ করার পর রাজা রামমোহন রায় কিছুদিন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসনিক বিভাগে কাজ করেন। রংপুরের তৎকালীন কালেক্টর জন ডিগবির অধীনে তিনি রাজস্ব বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দক্ষতার জন্য উচ্চ পদে উন্নীত হন। তবে সরকারি চাকরির চেয়ে সমাজসংস্কার, শিক্ষা বিস্তার এবং সাহিত্যচর্চাকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
পরবর্তীকালে তিনি চাকরি ছেড়ে সমাজকল্যাণমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করেন। প্রথমে মুর্শিদাবাদে এবং পরে কলকাতার মানিকতলায় বসবাস শুরু করেন। সেখানেই তিনি আত্মীয় সভা প্রতিষ্ঠা করেন, যা সমাজ ও ধর্মীয় সংস্কার নিয়ে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। পাশাপাশি জনমত গড়ে তুলতে তিনি বাংলা ভাষায় ‘ব্রাহ্মণ পত্রিকা’ এবং ইংরেজিতে ‘Bengal Herald’-এর মতো সংবাদপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নেন। সংবাদপত্র ও লেখালেখির মাধ্যমে তিনি সমাজে যুক্তিবাদী চিন্তা, শিক্ষা এবং সংস্কারের বার্তা ছড়িয়ে দেন।
রামমোহন রায়ের ব্রহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠা
১৮২৮ সালে রাজা রামমোহন রায় ব্রাহ্মসভা প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীকালে ব্রাহ্মসমাজ নামে পরিচিতি লাভ করে। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি একেশ্বরবাদ, যুক্তিবাদ এবং ধর্মীয় সংস্কারের বার্তা প্রচার করেন। তাঁর মতে, বেদে বর্ণিত ঈশ্বর এক, অদ্বিতীয় এবং নিরাকার। তাই তিনি মূর্তিপূজার পরিবর্তে নিরাকার ঈশ্বরের উপাসনার উপর গুরুত্ব দেন। রামমোহন রায়ের এই নতুন ধর্মীয় চিন্তাধারা সেই সময় সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আজও পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ব্রাহ্মসমাজের আদর্শ ও ব্রাহ্মধর্মের অনুসারীরা তাঁর চিন্তাভাবনাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে অনুসরণ করে চলেছেন।
রামমোহন রায়ের সতীদাহ প্রথা
রাজা রামমোহন রায় সমাজে প্রচলিত অমানবিক সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। সেই সময় স্বামীর মৃত্যুর পর অনেক হিন্দু বিধবা নারীকে সামাজিক ও ধর্মীয় চাপের মুখে স্বামীর চিতায় আত্মাহুতি দিতে বাধ্য করা হতো। এই নিষ্ঠুর প্রথাকে তিনি মানবিকতা, যুক্তি এবং ধর্মীয় ব্যাখ্যার মাধ্যমে দৃঢ়ভাবে চ্যালেঞ্জ করেন। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা ও আন্দোলনের ফলে তৎকালীন গভর্নর-জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮২৯ সালে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করার আইন কার্যকর করেন। এর ফলে ভারতীয় সমাজে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা হয়। শুধু সতীদাহ প্রথাই নয়, বাল্যবিবাহ, কন্যাপণসহ বিভিন্ন সামাজিক কুসংস্কার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধেও তিনি সোচ্চার ছিলেন এবং সমাজকে আরও মানবিক ও প্রগতিশীল করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
রামমোহন রায়ের রাজা উপাধি
রাজা রামমোহন রায়ের জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর শাহের প্রতিনিধি হিসেবে ইংল্যান্ড সফর। সম্রাটের ভাতা বৃদ্ধি এবং তাঁর স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি ১৮৩১ সালে ইংল্যান্ডে যান। সেখানে ব্রিটিশ সরকারের কাছে সম্রাটের দাবি তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং তাঁর যুক্তিপূর্ণ বক্তব্যের জন্য বিশেষ প্রশংসা লাভ করেন। ইংল্যান্ডে যাত্রার আগে সম্রাট দ্বিতীয় আকবর শাহ তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ‘রাজা’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এরপর থেকেই তিনি ইতিহাসে রাজা রামমোহন রায় নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
রামমোহন রায়ের মৃত্যু
১৮৩৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল শহরে রাজা রামমোহন রায়ের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তাঁকে প্রথমে ব্রিস্টলের স্ট্যাপলটন গ্রোভে সমাহিত করা হয়। পরে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও বিশিষ্ট সমাজসেবী প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের উদ্যোগে তাঁর মরদেহ ব্রিস্টলের Arnos Vale Cemetery-তে স্থানান্তর করা হয়। আজও সেখানে তাঁর সমাধিসৌধ সংরক্ষিত রয়েছে এবং ভারতীয় নবজাগরণের এই মহান পথিকৃৎকে শ্রদ্ধা জানাতে দেশ-বিদেশের বহু মানুষ সেখানে যান।
