সাদিকুল খান, কলকাতাঃ তৃণমূলের সুসময়ে দলের অন্দরে অনেকটাই কোণঠাসা ছিলেন তিনি। একসময় নন্দীগ্রামে ‘দাপুটে’ তৃণমূল নেতাদের ভিড়ে নির্দল প্রার্থী হিসেবেও ভোটে লড়েছিলেন সঞ্চিতা প্রধান দে। কিন্তু দীর্ঘ ১৫ বছর রাজ্যে ক্ষমতায় থাকার পর এখন তৃণমূলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলেছে। উপনির্বাচনে দলের অনেক ‘দাপুটে’ নেতাই প্রার্থী হতে অনীহা দেখাচ্ছেন। আর সেই সময়েই মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন সঞ্চিতা। শুভেন্দু অধিকারীর ছেড়ে যাওয়া আসনে এবার তাঁকেই প্রার্থী করেছে তৃণমূল।
কে এই সঞ্চিতা? নন্দীগ্রামে তৃণমূলের নতুন মুখ
গত বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে তৃণমূলের প্রার্থী ছিলেন পবিত্র কর। ভোটের কয়েক দিন আগে বিজেপি থেকে তাঁকে তৃণমূলে এনে শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামিয়েছিল তৎকালীন শাসকদল। পবিত্রের মতো সঞ্চিতারও বাড়ি নন্দীগ্রামের বয়ালে। পেশায় তিনি একজন শিক্ষিকা। তবে রাজনীতির ময়দানে একেবারেই নতুন মুখ নন সঞ্চিতা। বছর তিনেক আগেই নন্দীগ্রামে বিক্ষুব্ধ তৃণমূলের অন্যতম নেত্রী হিসেবে তাঁর পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। সেই সঞ্চিতাকেই এ বার শুভেন্দুর গড়ে প্রার্থী করে নতুন করে চ্যালেঞ্জ ছুড়ল তৃণমূল।
২০১৩ ও ২০১৮ সালে তৃণমূলের টিকিটে জয়
শিক্ষকতার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত সঞ্চিতা। নন্দীগ্রামের বয়াল-২ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার বাসিন্দা এই শিক্ষিকা পঞ্চায়েত সমিতির প্রাক্তন কর্মাধ্যক্ষও। তৃণমূলেই তাঁর রাজনৈতিক হাতেখড়ি। ২০১৩ এবং ২০১৮ সালে তৃণমূলের টিকিটে পঞ্চায়েত সমিতির নির্বাচনে জয়ী হন তিনি। প্রথম বার নারী ও শিশুকল্যাণ দফতরের কর্মাধ্যক্ষ এবং পরের বার শিক্ষা কর্মাধ্যক্ষের দায়িত্ব সামলান। তবে ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল তাঁকে টিকিট দেয়নি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সরব হন সঞ্চিতা এবং নির্দল প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়াই করেন। যদিও সেই ভোটে তিনি জিততে পারেননি। এরপর ধীরে ধীরে নন্দীগ্রামের রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয়তা অনেকটাই আড়ালে চলে যায়। সেই সঞ্চিতাকেই এ বার সরাসরি বিধানসভা উপনির্বাচনে প্রার্থী করে বড় চমক দিল তৃণমূল।
নন্দীগ্রামের নেতারা পিছিয়ে, সঞ্চিতার উপর ভরসা মমতার
নন্দীগ্রামে এত দিন তৃণমূলের প্রথম সারির নেতা হিসেবে পরিচিত অনেকেই উপনির্বাচনে প্রার্থী হতে রাজি ছিলেন না। শেখ সুফিয়ান, আবু তাহেরের মতো নেতারাও দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন। এই পরিস্থিতিতে বিজেপিও কটাক্ষ করে বলেছিল, নন্দীগ্রামে কালীঘাট তৃণমূল প্রার্থী দিতে পারলে প্রচারের দায়িত্বও না হয় তারাই নেবে। এমন টানাপোড়েনের মধ্যেই শেষ পর্যন্ত সঞ্চিতাকে প্রার্থী করেছে কালীঘাট তৃণমূল। প্রার্থী হওয়ার পর সঞ্চিতা বলেন, ‘‘প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অসংখ্য ধন্যবাদ। তিনি আমার উপর ভরসা করেছেন। দল আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে, তা পালন করার জন্য আমি নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করব।’’ জয়ের বিষয়ে অবশ্য এখনই নিশ্চিত কোনও দাবি করছেন না তিনি। তবে ভোটের ময়দানে ১০০ শতাংশ দিয়ে লড়াই করার বার্তা দিয়েছেন সঞ্চিতা।
২০১৪ সালের টেট মামলায় ২০২২ সালে মোট ২৬৯ জন প্রাথমিক শিক্ষককে বরখাস্তের নির্দেশ দিয়েছিল কলকাতা হাই কোর্ট। তাঁদের মধ্যে একজন সঞ্চিতা। যদিও ওই নির্দেশের পর স্থগিতাদেশও আসে। চার মাস পর আবার শিক্ষকতা শুরু করেন তিনি। কালীঘাট তৃণমূলের একটি সূত্রে খবর, কুণাল ঘোষের হাত ধরে আবার ‘দিদি’র শিবিরের ঘনিষ্ঠ হয়েছেন একদা বিক্ষুব্ধ তৃণমূল নেত্রী। দলের খারাপ সময়ে শীর্ষ নেতৃত্বের কাছাকাছি এলেন। এখন প্রার্থীও করা হল। সঞ্চিতার জবাব, ‘‘আমার উপর ভরসা যখন করেছেন, লড়াই তো দেবই। বাকি সব অতীত।’’
