ভারতবর্ষে ঘিয়ের (Ghee) ব্যবহার বৈদিক যুগ থেকেই চলে আসছে। শুধু রান্না বা খাবারে নয়, চিকিৎসা থেকে শুরু করে যাগ-যজ্ঞ—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই ঘির ব্যবহার রয়েছে। ঘিতে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ২০ থেকে ২৫ শতাংশ মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট, ৩ থেকে ৪ শতাংশ পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং বেশ কিছু ভিটামিন থাকে। শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু ভালো ফ্যাট থাকলেও ঘিতে থাকা স্যাচুরেটেড ফ্যাট অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে কোলেস্টেরলের মাত্রা, বিশেষ করে খারাপ কোলেস্টেরল (LDL), বাড়তে পারে। তাই ঘি একেবারে ক্ষতিকর বা সম্পূর্ণ উপকারী—দুটির কোনওটাই পুরোপুরি ঠিক নয়। বরং পরিমাণ বুঝে খেলে ঘি খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। তবে ঘি নিয়ে নানা ধরনের দাবি ও ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। কোন তথ্য সত্যি আর কোনটি শুধুই প্রচলিত ধারণা, তা জেনে নেওয়া যাক।
প্রতিদিন ঘি খাওয়া কি ভালো
ঘি খেলেই যে ওজন বেড়ে যাবে, এমনটা নয়। আসলে ওজন বাড়ার মূল কারণ হলো শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ক্যালরি গ্রহণ করা। তবে ঘিতে ক্যালরির পরিমাণ বেশি এবং এতে যথেষ্ট স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে, তাই অতিরিক্ত ঘি খেলে মোট ক্যালরি বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি কোলেস্টেরলের মাত্রাও বাড়তে পারে। তাই দৈনিক খাবারের মোট ক্যালরির হিসাবের মধ্যে রেখে পরিমিত পরিমাণে ঘি খেলে সাধারণত সমস্যা হয় না। ফলে প্রতিদিনের খাবারে অল্প পরিমাণে ঘি রাখা যেতে পারে, তবে পরিমাণের দিকে অবশ্যই নজর রাখা জরুরি।
ঘি খেলে কি রক্তনালী বন্ধ হয়ে যায়?
এই ধারণাটি পুরোপুরি সঠিক নয় যে ঘি খেলেই রক্তনালী বন্ধ হয়ে যায়। পরিমিত পরিমাণে ঘি খেলে সরাসরি রক্তনালীতে ব্লকেজ তৈরি হয় না। তবে ঘিতে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকায়, দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত ঘি খাওয়ার অভ্যাস থাকলে লো-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন (LDL) বা ‘খারাপ কোলেস্টেরল’-এর মাত্রা বাড়তে পারে। আর দীর্ঘদিন উচ্চ LDL-এর সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো সমস্যা থাকলে ধমনিতে প্লাক জমার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
একজন মানুষ দিনে কতটা পরিমাণে ঘি খেতে পারেন?
আইসিএমআর ২০২৪-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের প্রতিদিনের খাবারে মোট তেল ও চর্বির পরিমাণ পরিমিত রাখা উচিত। অন্যদিকে, আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (AHA) পরামর্শ দেয়, দৈনিক মোট ক্যালোরির ৬ শতাংশের কম স্যাচুরেটেড ফ্যাট থেকে আসা ভালো। যেমন, কারও দৈনিক ২,০০০ ক্যালোরির প্রয়োজন হলে স্যাচুরেটেড ফ্যাট থেকে ১২০ ক্যালোরির বেশি না নেওয়াই ভালো। তাই অন্যান্য তেল ও চর্বির পরিমাণ বিবেচনায় রেখে প্রতিদিন প্রায় ১–২ চা-চামচ, অর্থাৎ ৫–১০ গ্রাম ঘি খাওয়া যেতে পারে।
ঘি কি পেটের আলসার ঠিক করে দেয়?
ঘিতে থাকা মনোস্যাচুরেটেড ও পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট শরীরের জন্য কিছুটা উপকারী হলেও এগুলোকে সরাসরি ‘অপরিহার্য’ বলা ঠিক নয়। এছাড়া ঘিতে বিউটারিক অ্যাসিড, লিনোলিক অ্যাসিডসহ বেশ কিছু ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে, যা শরীরের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে এবং পরিমিত পরিমাণে খেলে হজমের ক্ষেত্রেও কিছু উপকার মিলতে পারে। তবে ঘি খেলেই পেটের আলসার সেরে যায়—এমন দাবির পক্ষে বর্তমানে নির্দিষ্ট ও শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তাই আলসারের চিকিৎসায় ঘিকে ওষুধের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
ঘি কি তেলের থেকে ভালো?
এর উত্তর হল, না। পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন। স্যাচুরেটেড ফ্যাটের কারণে রান্নায় নিয়মিতভাবে তেলের বদলে ঘি ব্যবহার করা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তবে তেল ও ঘি – দুয়ের ব্যবহারই নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত।
