১ এপ্রিল থেকে ভারতে নতুন অর্থবর্ষ শুরু হয়, আর প্রতি বছরের মতো এবারও আয়কর সংক্রান্ত নিয়মে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। ১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে কার্যকর হচ্ছে নতুন আয়কর আইন, ২০২৫—যার লক্ষ্য কর ব্যবস্থা সহজ করা, ভাষা আরও পরিষ্কার করা এবং অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমানো। সাধারণ করদাতাদের জন্য স্বস্তির খবর হল, ট্যাক্স স্ল্যাবে কোনও পরিবর্তন হয়নি—অর্থাৎ করের হার আগের মতোই থাকছে।
১. ডিফল্ট ট্যাক্স ব্যবস্থা (New Tax Regime)
এখন থেকে ‘নতুন কর ব্যবস্থা’ (New Tax Regime) ডিফল্ট হিসেবে সেট করা থাকবে। অর্থাৎ, আপনি যদি নিজে থেকে ফর্ম জমা দিয়ে পুরনো কর ব্যবস্থা (Old Tax Regime) বেছে না নেন, তবে আপনার আয়কর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন নিয়মেই হিসেব করা হবে।
২. ট্যাক্স ইয়ার’ (Tax Year) ধারণার সূচনা
এতদিন সাধারণ করদাতাদের কাছে ‘ফিনান্সিয়াল ইয়ার’ (FY) এবং ‘অ্যাসেসমেন্ট ইয়ার’ (AY) বিষয়টি বেশ বিভ্রান্তিকর ছিল। নতুন আইনে এই জটিলতা দূর করে একটিমাত্র ‘ট্যাক্স ইয়ার’ ধারণা চালু করা হচ্ছে। ফলে এখন থেকে কর দাখিলের হিসাব হবে অনেক সহজ।
৩. ITR দাখিলের নতুন সময়সীমা
নতুন নিয়মে কর দাখিলের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে:
বেতনভোগী (ITR-1/2): শেষ তারিখ ৩১ জুলাই।
ব্যবসা বা পেশা (অডিট ছাড়া): শেষ তারিখ ৩১ আগস্ট।
অডিট প্রয়োজন এমন ক্ষেত্রে: শেষ তারিখ ৩১ অক্টোবর।
বিশেষ ক্ষেত্র: ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত।
সংশোধিত রিটার্ন: রিটার্নে ভুল থাকলে তা সংশোধনের সময়সীমা ৯ মাস থেকে বাড়িয়ে ১২ মাস করা হয়েছে। তবে ৯ মাস পেরিয়ে গেলে আয়ের ভিত্তিতে জরিমানা দিতে হবে।
৪. বিনিয়োগ ও লেনদেনে নতুন নিয়ম
শেয়ার বাজার: ডেরিভেটিভস ট্রেডিংয়ের ওপর STT (Securities Transaction Tax) বাড়ছে, ফলে ট্রেডিং খরচ বাড়বে। শেয়ার বাইব্যাক থেকে হওয়া আয় এখন থেকে ক্যাপিটাল গেইন হিসেবে গণ্য হবে এবং সেই অনুযায়ী কর দিতে হবে।
বিদেশে অর্থ পাঠানো (LRS): শিক্ষা ও চিকিৎসার প্রয়োজনে বিদেশে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে TCS (Tax Collected at Source) কমিয়ে ২% করা হয়েছে।
PAN কার্ড: প্যান সংক্রান্ত নিয়ম আরও কড়া হচ্ছে। বড় আর্থিক লেনদেনে নজরদারি বাড়বে।
৫. বেতন কাঠামোয় বড় বদল (New Salary Structure)
নতুন শ্রম আইন ও আয়কর বিধির সমন্বয়ে আপনার টেক-হোম স্যালারি বা হাতে পাওয়া বেতনে পরিবর্তন আসতে পারে:
বেসিক স্যালারি: মূল বেতন বা বেসিক স্যালারি অবশ্যই আপনার মোট বেতনের (CTC) অন্তত ৫০% হতে হবে।
PF ও গ্র্যাচুইটি: বেসিক বাড়ার কারণে প্রভিডেন্ট ফান্ড (PF) এবং গ্র্যাচুইটির জন্য কাটা টাকার পরিমাণ বাড়বে। এতে বর্তমান হাতে পাওয়া বেতন কিছুটা কমলেও আপনার ভবিষ্যৎ সঞ্চয় অনেক মজবুত হবে।
৬. যে ক্ষেত্রগুলোতে মিলবে স্বস্তি
নতুন নিয়মে বেশ কিছু করছাড়ের সুবিধা দেওয়া হয়েছে:
মোটর দুর্ঘটনা: দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণের সুদের ওপর এখন থেকে কোনো কর বা TDS লাগবে না।
পরিবহন খরচ: অফিস যাতায়াতের জন্য কোম্পানি প্রদত্ত কনভেন্স অ্যালাউন্স বা পরিবহন খরচ সম্পূর্ণ করমুক্ত।
ট্যাক্স স্ল্যাব: স্বস্তির বিষয় হলো, করের হারে কোনো পরিবর্তন করা হয়নি, অর্থাৎ আগের হারই বজায় থাকছে।
আপনার ওপর প্রভাব: কোনটি বেছে নেবেন?
নতুন কর ব্যবস্থা (New Tax Regime): আপনি যদি খুব বেশি বিনিয়োগ (যেমন- PPF, LIC, ELSS) না করেন এবং সহজ পদ্ধতিতে কম হারে ট্যাক্স দিতে চান, তবে এটি আপনার জন্য সেরা।
পুরনো কর ব্যবস্থা (Old Tax Regime): আপনার যদি হোম লোন (Section 24), জীবন বিমা, বাচ্চাদের স্কুলের ফি বা স্বাস্থ্য বিমা (Section 80C, 80D) বাবদ বড় অংকের বিনিয়োগ থাকে এবং সেই ছাড়গুলো দাবি করতে চান, তবে পুরনো ব্যবস্থায় আপনি বেশি লাভবান হতে পারেন।
মনে রাখবেন: আপনি যদি বেতনভোগী কর্মচারী হন, তবে প্রতি বছর রিটার্ন জমার সময় এই ব্যবস্থা বদলানোর সুযোগ পাবেন। কিন্তু আপনার যদি ব্যবসায়িক আয় থাকে, তবে একবার নতুন ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে গেলে পুনরায় ফিরে আসা কঠিন হতে পারে।
সহজ ভাবে বললে, নতুন এই নিয়ম আপনার বর্তমানের চেয়ে ভবিষ্যতের সুরক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। মাস শেষে হাতে পাওয়া বেতন সামান্য কমলেও আপনার PF ও সঞ্চয় বাড়বে। পাশাপাশি আয়কর দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ হওয়ায় সাধারণ মানুষের হয়রানি কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে আপনি লাভবান হবেন।
