সাদিকুল খান কলকাতা: রাজধানী দিল্লিতে ফের বাড়ছে সোয়াইন ফ্লু বা H1N1 ভাইরাসের প্রকোপ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবার সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্য নির্দেশিকা জারি করেছে দিল্লি সরকার। সংক্রমণ থেকে বাঁচতে ভিড় বা জনবহুল জায়গায় মাস্ক পরার পাশাপাশি নিয়মিত ও ভালোভাবে হাত ধোওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ফ্লু-র উপসর্গ দেখা দিলে তা অবহেলা না করে নজর রাখার কথা বলা হয়েছে। জ্বর, কাশি, সর্দি বা অন্যান্য উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আবেদন জানিয়েছে সরকার।
স্বাস্থ্য দফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে দিল্লিতে এখনও পর্যন্ত ১,৭৭৭টি H1N1 সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এর পাশাপাশি ৩৭টি H1 এবং ১৩৮টি H3 সংক্রমণেরও হদিশ মিলেছে। সব মিলিয়ে দিল্লিতে ইনফ্লুয়েঞ্জা আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২,৬০২। শুধু বৃহস্পতিবারই নতুন করে ১১৪ জনের শরীরে সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে আরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রকাশ্যে হাঁচি বা কাশির সময় মুখ-নাক ঢেকে রাখা, অযথা চোখ, নাক ও মুখে হাত না দেওয়া এবং যেখানে-সেখানে থুতু না ফেলার মতো অভ্যাস মেনে চলতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি, ফ্লু-র উপসর্গ রয়েছে এমন ব্যক্তির থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা, পর্যাপ্ত জলপান করা এবং খুব প্রয়োজন না হলে অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে স্বাস্থ্য দফতর। (Swine Flu Alert)
ফরিদাবাদের ‘অমৃতা হাসপাতাল’-এর চিকিৎসক অর্জুন খন্না জানিয়েছেন, ফ্লু-র উপসর্গ দেখা দিলে তা কোনওভাবেই হালকা ভাবে নেওয়া উচিত নয়। তাঁর মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইনফ্লুয়েঞ্জা সংক্রমণ নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে কখনও কখনও এই সংক্রমণ থেকে ভাইরাল নিউমোনিয়া, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া বা শ্বাসযন্ত্রের কার্যক্ষমতা ব্যাহত হওয়ার মতো গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী মহিলা, হৃদরোগ বা ফুসফুসের সমস্যায় আক্রান্ত এবং শারীরিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি।
ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত অধিকাংশ রোগী সাধারণ চিকিৎসাতেই ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে সংক্রমণ গুরুতর আকার নিতে পারে। তাই শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট বা হাঁফিয়ে ওঠা, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া, বুকে অস্বস্তি বা ব্যথা অনুভূত হওয়া, বিভ্রান্তি বা অস্বাভাবিকভাবে ঝিমুনি আসা, একটানা জ্বর থাকা এবং সময়ের সঙ্গে শরীর আরও দুর্বল হয়ে পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
ইনফ্লুয়েঞ্জা যে কোনও বয়সের মানুষের হতে পারে। তবে বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী মহিলা, হৃদরোগ বা ফুসফুসের সমস্যায় আক্রান্ত এবং যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাঁদের ক্ষেত্রে গুরুতর সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। এছাড়া বিপাকীয় সমস্যা রয়েছে এমন ব্যক্তিদেরও বাড়তি সতর্ক থাকা প্রয়োজন। H1N1 যেহেতু ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, তাই অ্যান্টিবায়োটিক সরাসরি এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে না। তবে সংক্রমণের পাশাপাশি ব্যাকটেরিয়াজনিত সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হতে পারে। তাই নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া উচিত নয়। সংক্রমণ এড়াতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দেওয়ার পাশাপাশি জনবহুল জায়গায় মাস্ক ব্যবহার করা জরুরি, বিশেষ করে জ্বর, সর্দি বা শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা থাকলে। হাঁচি-কাশির সময় টিস্যু, রুমাল বা কনুই দিয়ে মুখ-নাক ঢেকে রাখতে হবে এবং সরাসরি হাতের উপর হাঁচি-কাশি না দেওয়াই ভালো।
বাইরে থেকে ফিরে এবং হাঁচি-কাশির পর সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিতে হবে। হাত না ধুয়ে চোখ, নাক বা মুখে হাত দেওয়া এড়িয়ে চলুন। জ্বর, সর্দি বা শ্বাসজনিত সমস্যা হলে বাড়িতে থেকে বিশ্রাম নেওয়া এবং অন্যদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখাও জরুরি। পর্যাপ্ত জল পান করতে হবে, বিশেষ করে বেশি ঘাম হলে বা খাওয়ার ইচ্ছে কম থাকলে। পাশাপাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জার বিরুদ্ধে টিকাকরণও গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসক অর্জুন খন্নার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ সালের তথ্য বলছে, টিকা নেওয়া থাকলে সংক্রমণের ঝুঁকি প্রায় ৩০ শতাংশ কমতে পারে এবং সংক্রমণ হলেও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট বলছে, প্রতিবছর পৃথিবীতে ১০০ কোটি মানুষ ইনফ্লুয়েঞ্জায় সংক্রমিত হন। অবস্থা গুরুতর হয় লক্ষ লক্ষ মানুষের। তবে অযথা আতঙ্কিত হবেন না। সতর্ক থাকুন। ফ্লু-র উপসর্গ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, শ্বাসকষ্ট শুরু হয় যদি,জ্বর যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, বুকে যদি অস্বস্তি অনুভব করেন, অবশ্যই চিকিৎসা করান।
