গৃহঋণের সঠিক পরিমাণ কত হওয়া উচিত— এই প্রশ্নের উত্তর শুধু আয় বা অর্থনীতির হিসাব দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। যেমন, সাধারণভাবে দেখা যায় এক জন গড়পড়তা মার্কিন নাগরিক ভবিষ্যতের আয়কে মাথায় রেখে তুলনামূলক বেশি ঋণ নিতে স্বচ্ছন্দ হলেও, জাপানে আর্থিক সিদ্ধান্তে বেশি সতর্কতা দেখা যায়। একইভাবে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলেও ঋণ নেওয়ার প্রবণতায় পার্থক্য রয়েছে। বাঙালিদের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকভাবে সঞ্চয়ের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি এবং ঋণ নেওয়ার বিষয়ে কিছুটা সংযত মনোভাব দেখা যায়। অনেকের কাছে ঋণ মানে বাড়তি আর্থিক দায়, আর আয় কমে গেলে বা ঋণ শোধে সমস্যা হলে সামাজিক চাপও অনুভূত হতে পারে। তবে এই প্রবণতা ব্যক্তি, আয়, পেশা ও প্রজন্মভেদে বদলাচ্ছে। বর্তমানে বাড়ি কেনা, ব্যবসা বা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পরিকল্পিত ও সামর্থ্য অনুযায়ী ঋণ নেওয়ার প্রবণতাও ধীরে ধীরে বাড়ছে।
ঋণ না করেও সঞ্চয়ের লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব— তবে তার জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত খরচ এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক শৃঙ্খলা। পরিবারের মোট উপার্জনের তুলনায় ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা, প্রয়োজন আর ইচ্ছার মধ্যে পার্থক্য করা এবং অপ্রয়োজনীয় ভোগবাদের চাপ এড়িয়ে চলা। বিশেষ করে শুধুমাত্র জীবনযাত্রার মান দেখানোর জন্য বা বিলাসবহুল খরচ মেটাতে ঋণ নেওয়া এড়িয়ে গেলে ভবিষ্যতের আর্থিক চাপ অনেকটাই কমানো যায়। এভাবে ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া সঞ্চয় ভবিষ্যতে জরুরি খরচ, সন্তানের পড়াশোনা, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ব্যয় বা বড় জীবনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়ক হতে পারে।
সঞ্চয়কে অনেকেই ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার ভিত্তি বলে মনে করেন। তাই কোথা থেকে, কতটা এবং কীভাবে সঞ্চয় করা হবে— সেই বিষয়ে পরিবারের সচেতন পরিকল্পনা থাকা জরুরি। শুধু টাকা জমিয়ে রাখলেই হয় না, সময়ের সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতির প্রভাবও মাথায় রাখতে হয়, যাতে ভবিষ্যতের প্রয়োজনের সময় সেই সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য বজায় থাকে। পাশাপাশি আর্থিক পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল অপ্রয়োজনীয় ঋণের ফাঁদ এড়িয়ে চলা। বিশেষ করে আকস্মিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত খরচ অনেক পরিবারকে আর্থিক চাপে ফেলতে পারে। তাই আয় ও প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যবিমা রাখা জরুরি, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে সঞ্চয় ভেঙে ফেলা বা অতিরিক্ত ঋণের ওপর নির্ভর করতে না হয়।
আগের ঋণ শোধ করার জন্য আবার ঋণ নেওয়াও ঋণের ফাঁদের মধ্যেই পরে। এই চক্রটি প্রথম থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে সঞ্চয় বাড়ানো দরকার। শুধু তাই নয়, বন্ধু ও পরিবারের সাহায্য নিয়ে ঋণের চাপে নড়বড়ে পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠা জরুরি।
