কুসুম দাস, কলকাতাঃ নিপাহ ভাইরাস (NiV) একটি জুনোটিক ভাইরাস, অর্থাৎ এটি প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। মূলত ফলভোজী বাদুড় বা ‘উড়ন্ত শিয়াল’-কে এই ভাইরাসের প্রধান বাহক হিসেবে ধরা হয়। এছাড়া শূকরসহ অন্যান্য সংক্রামিত প্রাণীর রক্ত, লালা, মল বা মূত্রের সংস্পর্শে এলেও সংক্রমণ হতে পারে। সংক্রামিত প্রাণীর সংস্পর্শে থাকা খাবার খেলেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আবার নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির খুব কাছাকাছি থাকলে, বিশেষ করে তাঁর সেবা-শুশ্রূষার সময় শারীরিক তরলের মাধ্যমে মানুষ থেকে মানুষেও সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
নিপাহ ভাইরাস কোথায় পাওয়া যায়?
এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতে, সময় সময় নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। ১৯৯৯ সালে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে ভয়াবহ সংক্রমণের সময় প্রথমবার এই ভাইরাস শনাক্ত হয়। ওই প্রাদুর্ভাবে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বিপুল সংখ্যক শূকর মারা যায়, যার প্রভাব পড়ে স্থানীয় অর্থনীতিতেও। এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে একাধিক দেশে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা গেছে।
নিপাহ ভাইরাস কী
নিপাহ ভাইরাস একটি জুনোটিক ভাইরাস, যা সাধারণত সংক্রামিত প্রাণী বা প্রাণীর দেহতরলের সংস্পর্শের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তবে আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক তরলের সংস্পর্শে এলে মানুষ থেকেও মানুষে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণে জ্বর, শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা এবং গুরুতর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস হতে পারে। বিশেষ করে এনসেফালাইটিস দেখা দিলে রোগীর অবস্থা দ্রুত গুরুতর হয়ে উঠতে পারে এবং মৃত্যুর ঝুঁকিও অনেক বেড়ে যায়।
আরও পড়ুন: মিষ্টি তাল নাকি তেতো? হাতে নিয়েই বুঝবেন, শুধু দেখুন এই ৫টি বিষয়
নিপাহ ভাইরাস কীভাবে বুঝবেন
নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে শুরুতে জ্বর, মাথাব্যথা, কাশি, গলা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া, বমি, পেশিতে ব্যথা এবং শরীরে তীব্র দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সাধারণত ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ৪ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে এসব লক্ষণ প্রকাশ পায়। অনেক ক্ষেত্রে প্রথমে জ্বর বা মাথাব্যথা শুরু হয়ে পরে কাশি ও শ্বাসকষ্টের মতো শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে সংক্রমণ গুরুতর হলে মস্তিষ্কে প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস হতে পারে, যা প্রাণঘাতীও হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিভ্রান্তি, দিশেহারা হয়ে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, খিঁচুনি, কোমা এবং তীব্র শ্বাসকষ্টের মতো গুরুতর লক্ষণ দেখা দিতে পারে। আবার কিছু আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে কোনো উপসর্গ নাও দেখা যেতে পারে।
নিপাহ ভাইরাস ইনফেকশন কী?
নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে সতর্ক থাকতে কাঁচা খেজুরের রস পান না করাই ভালো। খেজুরের রস ভালোভাবে ফুটিয়ে নিলে এতে থাকা ভাইরাস নিষ্ক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি কমে, তাই রস খাওয়ার আগে ভালোভাবে জ্বাল দিয়ে ঠান্ডা করে নেওয়া উচিত। খেজুরের রস থেকে তৈরি গুড় সাধারণত প্রক্রিয়াজাত ও উত্তপ্ত করা হয়, তাই সেটি কাঁচা রসের তুলনায় নিরাপদ। বাদুড়ের সংস্পর্শ এড়াতে রস সংগ্রহের হাঁড়ি বা পাত্র ভালোভাবে ঢেকে রাখাও জরুরি। পাশাপাশি গাছ থেকে পেড়ে খাওয়ার আগে ফল ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া উচিত এবং বাদুড়ে কামড়ানো বা আধখাওয়া ফল কখনোই খাওয়া যাবে না।
আরও পড়ুন: সব টিউমার কি ক্যানসার হয়? জানুন টিউমার ও ক্যানসারের আসল পার্থক্য
নিপাহ ভাইরাস কী কারণে হয়?
গবেষণায় জানা যায়, ফলভোজী বাদুড় ছিল এই ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক। কোনো সংক্রামিত প্রাণীর মূত্র, মল, রক্ত বা লালার মতো দেহরসের সংস্পর্শে এলে মানুষ বা অন্য প্রাণী আক্রান্ত হতে পারে। আবার আক্রান্ত ব্যক্তির দেহরসের সংস্পর্শেও মানুষ থেকে মানুষে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। সংক্রামিত প্রাণীর দেহরসের সংস্পর্শে এসে ফল বা কাঁচা খেজুরের রস দূষিত হলেও সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এমনকি বাদুড়ের বসবাস বা বিশ্রামের জায়গায় নিয়মিত যাতায়াত করেন, এমন মানুষদের ক্ষেত্রেও সংক্রমণের ঝুঁকি থাকতে পারে।
