পশ্চিম এশিয়ায় চলা যুদ্ধের প্রভাব ধীরে ধীরে বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে Iran–Israel conflict ঘিরে তৈরি হওয়া উত্তেজনার জেরে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে ইতিমধ্যেই উদ্বেগ বাড়ছে (Iran-Israel War)। রান্নার গ্যাস থেকে শুরু করে পেট্রোল-ডিজেলের বাজারে তার প্রভাব দেখা যাচ্ছে বলেই মনে করছেন অনেকেই। তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এর প্রভাব এখানেই থেমে থাকবে না—সামনের দিনে বড় ধাক্কা আসতে পারে ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজারেও। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যদি এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, ইন্ডাকশন কুকার, মাইক্রোওয়েভের মতো বিভিন্ন বৈদ্যুতিক পণ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।
হরমুজ প্রণালী নিয়েই উদ্বেগ
প্রসঙ্গত, পশ্চিম এশিয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হল Strait of Hormuz, যাকে বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র বলা হয়। এই প্রণালী দিয়েই বিশ্বের বড় অংশের তেল ও গ্যাস বিভিন্ন দেশে পরিবহন করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতের জেরে এই রুটে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ এবং বিভিন্ন কাঁচামালের উপর চাপ বাড়ছে। আর তারই প্রভাব পড়ছে শিল্প উৎপাদনের উপর। যার ফলস্বরূপ ভবিষ্যতে অনেক পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কেন বাড়তে পারে বৈদ্যুতিক পণ্যের দাম?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পিছনে মূলত দু’টি বড় কারণ কাজ করছে। প্রথমত, সালফিউরিক অ্যাসিডের সম্ভাব্য সংকট। সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ তৈরির ক্ষেত্রে এই অ্যাসিড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু সালফিউরিক অ্যাসিড তৈরির কাঁচামাল সালফার মূলত খনিজ তেল পরিশোধনের উপর নির্ভরশীল। ফলে তেলের সরবরাহে সমস্যা তৈরি হলে সালফারের উৎপাদনও কমে যেতে পারে এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে চিপ শিল্পে। দ্বিতীয় কারণটি হল চিপ উৎপাদনে সম্ভাব্য বাধা। বিশ্বের বড় অংশের সেমিকন্ডাক্টর চিপ তৈরি হয় Taiwan-এ। সেখানে এই কারখানাগুলি সচল রাখতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন, যার একটি বড় অংশ উৎপাদিত হয় এলএনজি থেকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে সেই বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে, আর তার ফলেই চিপ উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপে যুক্ত হোন -
এদিকে বাজার সূত্রে জানা যাচ্ছে, চলতি বছরের মার্চ মাসেই ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ কম্পিউটারের দাম প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে এমনই অনিশ্চিত থাকে, তাহলে আগামী অর্থবছরে এই দাম বাড়ার হার ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। শুধু স্মার্টফোন বা কম্পিউটারই নয়, এই প্রভাব পড়তে পারে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারেও। কারণ আধুনিক ইলেকট্রিক গাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ সেমিকন্ডাক্টর চিপ ও ইলেকট্রনিক কম্পোনেন্ট ব্যবহার করা হয়। আর সেই সরবরাহে সমস্যা তৈরি হলে গাড়ির উৎপাদন খরচও বেড়ে যেতে পারে।
পোশাক শিল্পে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা
প্রসঙ্গত, এই সংকটের প্রভাব পড়তে পারে বস্ত্রশিল্পের উপরেও। কারণ অনেক ধরনের পোশাক তৈরিতে ব্যবহৃত পলিয়েস্টার মূলত পেট্রোকেমিক্যাল থেকে তৈরি হয়, যা সরাসরি তেলের উপর নির্ভরশীল। ফলে তেলভিত্তিক কাঁচামালের দাম বাড়লে পোশাক শিল্পের উৎপাদন খরচও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ইতিমধ্যেই বাজারে পলিয়েস্টারের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানা যাচ্ছে, তার উপর তেল সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তাও রয়ে গেছে। সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যেভাবে বদলাচ্ছে তাতে বিশ্ব অর্থনীতির উপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে, আর তার প্রভাব ধীরে ধীরে বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রেই দেখা দিতে শুরু করেছে।
