JKNews24 Disk: চুল আঁচড়াতে গেলেই কাঁধে তীব্র ব্যথা? পেছনের পকেটে মোবাইল রাখতে হাত পৌঁছায় না? রাতে শোয়ার পর ব্যথায় ঘুম হয় না? তাহলে আপনি ফ্রোজেন শোল্ডার বা জমে যাওয়া কাঁধের সমস্যায় ভুগছেন। এই সমস্যা যতটা কষ্টদায়ক, ততটাই সাধারণ—বিশেষ করে ৪০-৬০ বছর বয়সীদের মধ্যে। তবে চিন্তা নেই, সঠিক ব্যায়াম এবং ফিজিওথেরাপিতে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
ফ্রোজেন শোল্ডার কী এবং কেন হয়?
ফ্রোজেন শোল্ডার (অ্যাডহেসিভ ক্যাপসুলাইটিস) হল কাঁধের জয়েন্টে শক্ত হওয়া এবং ব্যথা দ্বারা চিহ্নিত একটি মেডিকেল অবস্থা। কাঁধের হাড়গুলোকে ঘিরে থাকা ক্যাপসুল যখন প্রদাহ এবং শক্ত হয়ে যায়, তখন কাঁধ নড়াচড়া করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ডায়াবেটিস রোগীদের ফ্রোজেন শোল্ডার হওয়ার ঝুঁকি ১০-২০ শতাংশ এবং মহিলাদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। এছাড়াও থাইরয়েডের সমস্যা, হৃদরোগ, স্ট্রোক, বা কাঁধে আঘাতের পরেও এই সমস্যা হতে পারে।
কীভাবে বুঝবেন ফ্রোজেন শোল্ডার হয়েছে?
রাতে ঘুমাতে গেলে তীব্র ব্যথা, কাঁধের যে পাশে সমস্যা সেদিকে কাত হয়ে শুতে কষ্ট, এবং কাঁধের জয়েন্টে শক্তভাব অনুভূত হওয়া হল প্রধান লক্ষণ। দৈনন্দিন ছোট্ট কাজগুলোও দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে—চুল আঁচড়ানো, ব্রাশ করা, জামার বোতাম লাগানো, পেছনের পকেটে হাত দেওয়া, দরজার হাতল খোলা—সবেতেই ব্যথা এবং হাত আটকে যায়।
ফ্রোজেন শোল্ডার তিনটি পর্যায়ে বিকশিত হয়: ফ্রিজিং স্টেজ (ব্যথা বেশি), ফ্রোজেন স্টেজ (শক্ত হওয়া বেশি), এবং থউইং স্টেজ (ধীরে ধীরে সুস্থ হওয়া)।
কাঁধে ব্যথা? কেন ব্যায়াম এত জরুরি?
Harvard Medical School-এর মতে, ফ্রোজেন শোল্ডার এক্সারসাইজ এই অবস্থার চিকিৎসার মূল ভিত্তি এবং ৯০ শতাংশ রোগী নিয়মিত ব্যায়ামে উন্নতি দেখতে পায়। ব্যায়াম না করলে দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা, জয়েন্ট শক্ত হয়ে জমে যাওয়া, এবং গতিশীলতা কমে যাওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
শুরু করার আগে গুরুত্বপূর্ণ টিপস
ব্যায়াম শুরুর আগে সবসময় কাঁধ ওয়ার্ম-আপ করুন—১০-১৫ মিনিট গরম পানিতে গোসল করুন বা হিটিং প্যাড ব্যবহার করুন। এতে পেশী শিথিল হবে এবং ব্যায়াম সহজ হবে। টেনশন পর্যন্ত স্ট্রেচ করুন, কিন্তু ব্যথা পর্যন্ত নয়—এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম।
সহজ এবং কার্যকর ৫টি ব্যায়াম
১. পেন্ডুলাম এক্সারসাইজ (দোলনা ব্যায়াম)
কাঁধ শিথিল করুন এবং সামনে ঝুঁকে দাঁড়ান। আক্রান্ত হাতটি ঝুলিয়ে দিন এবং ছোট বৃত্তাকারে (প্রায় এক ফুট ব্যাসার্ধে) দুলতে থাকুন। প্রতিটি দিকে ১০টি করে ঘোরান, দিনে একবার করুন।
এই ব্যায়াম কাঁধে খুব বেশি চাপ না দিয়ে নড়াচড়া শুরু করতে সাহায্য করে। টেবিলে ভর দিয়ে করলে আরও সহজ হবে।
২. ওয়াল ওয়াক (দেওয়াল বেয়ে ওঠা)
দেওয়াল থেকে ১-২ ফুট দূরে দাঁড়ান এবং কোমরের উচ্চতায় দেওয়াল স্পর্শ করুন। ধীরে ধীরে আঙুল দিয়ে দেওয়ালে “হেঁটে” উপরের দিকে উঠুন—কাঁধ ব্যবহার না করে শুধু আঙুল দিয়ে। ১০-২০ বার পুনরাবৃত্তি করুন।
এই ব্যায়াম কাঁধের গতির পরিসর বাড়ায়। যতদূর যেতে পারেন ততদূর যান, কিন্তু জোর করবেন না।
৩. টাওয়েল স্ট্রেচ
একটি তোয়ালে বা স্কার্ফ নিন। ভালো হাত দিয়ে তোয়ালের এক প্রান্ত মাথার পেছনে ধরুন এবং আক্রান্ত হাত দিয়ে অন্য প্রান্ত পিঠের পেছনে ধরুন। ভালো হাত দিয়ে তোয়ালে উপরের দিকে টানুন, যাতে আক্রান্ত হাত স্ট্রেচ হয়।
প্রথমে অস্বস্তি লাগতে পারে, কিন্তু নিয়মিত করলে কাঁধের নমনীয়তা বাড়বে।
৪. আর্মপিট স্ট্রেচ
দরজার ফ্রেম বা দেওয়ালের কোণায় আঙুল আটকান এবং সামনে ঝুঁকে কাঁধ ও বুক জুড়ে স্ট্রেচ অনুভব করুন। এটি পেক্টোরাল পেশী স্ট্রেচ করে এবং কাঁধের সামনের দিকের আড়ষ্টতা কমায়।
৫. ক্রসওভার আর্ম স্ট্রেচ
ভালো হাত দিয়ে আক্রান্ত হাতের কনুই ধরুন এবং ধীরে ধীরে বুকের দিকে টানুন। ২০-৩০ সেকেন্ড ধরে রাখুন এবং ৩-৫ বার পুনরাবৃত্তি করুন।
কত দ্রুত ফল পাবেন?
ফ্রোজেন শোল্ডার থেকে সম্পূর্ণ সেরে উঠতে ১-৩ বছর সময় লাগতে পারে, কিন্তু নিয়মিত স্ট্রেচিং এবং শক্তিশালীকরণ ব্যায়াম ব্যথা কমাতে এবং কাঁধের কার্যকারিতা উন্নত করতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, ফিজিক্যাল থেরাপি প্রোগ্রাম রিকভারির চাবিকাঠি।
প্রথম ৭-১০ দিনে ব্যথায় উন্নতি দেখলে নতুন ব্যায়াম যোগ করতে পারেন। তবে ধৈর্য রাখা খুবই জরুরি—এই সমস্যা রাতারাতি সারে না।
আরও কিছু সাহায্যকারী টিপস
- আইস প্যাক ব্যবহার করুন: আইস প্যাক বা হিমায়িত সবজির প্যাক কাঁধে ১০-১৫ মিনিট দিনে কয়েকবার লাগালে ব্যথা কমে।
- ব্যথানাশক ওষুধ: আইবুপ্রোফেনের মতো NSAIDs ব্যথা এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
- ভারী জিনিস তুলবেন না: কাঁধের চাপ কমাতে ভারী জিনিস তোলা এড়িয়ে চলুন।
- ম্যাসাজ করুন: প্রতিদিন কাঁধে হালকা ম্যাসাজ পেশী শিথিল করতে সাহায্য করে।
কাঁধে ব্যথা? কখন ডাক্তার দেখাবেন?
যদি ব্যায়াম এবং হোম ট্রিটমেন্টে উন্নতি না হয়, বা ব্যথা আরও বাড়ে, তাহলে অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। কিছু ক্ষেত্রে স্টেরয়েড ইনজেকশন বা ফিজিওথেরাপিস্টের সাহায্য প্রয়োজন হতে পারে। খুব গুরুতর ক্ষেত্রে অ্যানেস্থেশিয়ার অধীনে ম্যানিপুলেশন বা আর্থ্রোস্কোপিক সার্জারি প্রয়োজন হতে পারে।
শেষ কথা
ফ্রোজেন শোল্ডার কষ্টদায়ক, কিন্তু হতাশ হবেন না। সঠিক ব্যায়াম, ধৈর্য, এবং নিয়মানুবর্তিতার সাথে বেশিরভাগ রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। প্রতিদিন এই সহজ ব্যায়ামগুলো করুন, ওয়ার্ম-আপ ভুলবেন না, এবং যন্ত্রণা সহ্যের বাইরে গেলে ডাক্তার দেখান। মনে রাখবেন—ব্যায়ামই সেরা ওষুধ!
সোর্স নোট: এই আর্টিকেলের তথ্য Harvard Health Publishing, PMC (PubMed Central), Hospital for Special Surgery, Physiopedia, এবং বিভিন্ন বিশ্বস্ত বাংলা মেডিকেল সোর্স থেকে নেওয়া হয়েছে। যেকোনো নতুন ব্যায়াম শুরু করার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।









