JKNews24 Disk: সন্তান জন্মের পর শরীর ও মনের ওপর যে ধকল যায়, তাতে কিছু পরিবর্তন হওয়াটা স্বাভাবিক—ক্লান্তি, হালকা ব্যথা, মুড সুইং বা ঘুমের সমস্যা অনেকেরই হয়। কিন্তু সব কিছুকেই “হয়েই থাকে” ভেবে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। কারণ প্রসবের পর কিছু উপসর্গ এমন আছে, যেগুলো শরীরের ভেতরের কোনও সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে এবং সময়মতো চিকিৎসা না নিলে তা জটিল আকারও নিতে পারে।
যেমন, খুব বেশি দিন ধরে বা অস্বাভাবিক মাত্রায় রক্তপাত, তীব্র তলপেট ব্যথা, জ্বর, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব, মাথা ঘোরা বা হঠাৎ শ্বাসকষ্ট—এগুলো মোটেই স্বাভাবিক নয়। আবার মন খারাপ দীর্ঘদিন ধরে থাকলে, অকারণে কান্না পেলে, সন্তান বা নিজের ক্ষতি করার ভাব এলে সেটাও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। অনেক মা এগুলোকে ক্লান্তি বা নতুন জীবনের চাপ ভেবে চুপ করে থাকেন, কিন্তু আসলে এই সময় শরীর-মন দু’টোকেই আলাদা যত্ন দরকার। তাই প্রসবের পর কোনও উপসর্গ যদি অস্বস্তিকর লাগে বা সময়ের সঙ্গে না কমে, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
Table of Contents
সন্তানজন্মের পর স্বাভাবিক সমস্যা
সন্তান জন্ম দেওয়ার পর একজন মা শুধু শিশুর যত্ন নিয়েই ব্যস্ত থাকেন—নিজের স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল দেওয়ার সময়ই পান না। কিন্তু জানেন কি, CDC-র তথ্য অনুযায়ী প্রসব-সম্পর্কিত মৃত্যুর এক-তৃতীয়াংশ ঘটে প্রসবের এক সপ্তাহ থেকে এক বছরের মধ্যে? আরও চমকপ্রদ ব্যাপার হল, এই মৃত্যুর ৮০ শতাংশেরও বেশি প্রতিরোধযোগ্য—শুধু সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসা নিলেই।
প্রসবের পর শরীরে অনেক পরিবর্তন হয়—কিছু স্বাভাবিক, কিছু মারাত্মক। সমস্যা হল, অনেক সময় মায়েরা বুঝতে পারেন না কোনটা “নরমাল” আর কোনটা জরুরি চিকিৎসা দরকার। আসুন জেনে নিই এমন ৫টি লক্ষণ যা কখনও উপেক্ষা করা উচিত নয়।
1. ক্লান্তি
সন্তান প্রসবের ধকলের সঙ্গে যদি অস্ত্রোপচারও হয়ে থাকে, তাহলে শরীর পুরোপুরি সেরে উঠতে কিছুটা সময় লাগেই—তবে চিকিৎসকদের মতে, সাধারণত সেটা ৬ থেকে ৮ সপ্তাহের বেশি হওয়ার কথা নয়। নিয়ম মেনে খাওয়া-দাওয়া, ঘুম আর পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার পরেও যদি মনে হয় শরীর ক্রমশ ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে, তাহলে বিষয়টা হালকাভাবে নেওয়া ঠিক নয়। এই সময়ে অনেক মায়ের শরীরে আয়রনের ঘাটতি দেখা যায়, কারও আবার প্রয়োজনীয় ভিটামিনের অভাব হয়। হিমোগ্লোবিন কমে গেলে রক্তাল্পতার সমস্যাও হতে পারে। কেন এমন হচ্ছে আর তার সঠিক সমাধান কী—সেটা একমাত্র চিকিৎসকই নির্দিষ্ট করে বলতে পারবেন। কারণ মা অতিরিক্ত ক্লান্ত হলে বা শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন-খনিজের অভাব থাকলে তার প্রভাব সরাসরি শিশুর স্বাস্থ্যের উপরও পড়তে পারে।
2. অতিরিক্ত রক্তপাত:
সন্তান প্রসবের পরে যোনিপথে কিছুদিন রক্তক্ষরণ হওয়া স্বাভাবিক, যাকে চিকিৎসার ভাষায় ‘লোকিয়া’ বলা হয়। সাধারণত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর মাত্রা কমতে থাকে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ছয় সপ্তাহের মধ্যেই তা বন্ধ হয়ে যায়। প্রথম দিকে রক্তপাত বেশি হলেও ধীরে ধীরে রঙ ও পরিমাণ বদলানোই স্বাভাবিক লক্ষণ।
কিন্তু ছয় সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার পরেও যদি দীর্ঘদিন রক্তক্ষরণ চলতেই থাকে, তাহলে সেটাকে আর স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। এর নেপথ্যে সংক্রমণ, হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া বা অন্য কোনও শারীরিক সমস্যা থাকতে পারে। অনেক সময় মায়েরা বিষয়টা গুরুত্ব না দিয়ে সহ্য করে যান, কিন্তু এতে সমস্যা আরও বাড়তে পারে। তাই এমন উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ কাজ।
March of Dimes এবং UNM Health-এর মতে, এই লক্ষণগুলো দেখলে সাথে সাথে ডাক্তার দেখান:
- প্রতি ঘণ্টায় এক প্যাড ভিজে যাওয়া বা তার বেশি
- ডিমের মতো বড় রক্ত জমাট বের হওয়া
- রক্তক্ষরণ সময়ের সাথে বাড়ছে, কমছে না
- রক্তপাত একবার থেমে গিয়ে আবার শুরু হচ্ছে (৬ সপ্তাহের মধ্যে)
3. প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারা
সন্তান প্রসবের পরে হাঁচি বা কাশি দেওয়ার সময় যদি প্রস্রাব বের হয়ে যায় এবং তা ধরে রাখা সম্ভব না হয়, তা স্বাভাবিকের কিছুটা অংশ হতে পারে—বিশেষ করে প্রথম মাসগুলোতে। তবে যদি এই সমস্যা এক মাসের পরও ঠিক না হয়, তখন তা হালকাভাবে নেওয়া ঠিক নয়। এর মূল কারণ হতে পারে ‘পেলভিক ফ্লোর মাসল’ দুর্বল হয়ে যাওয়া। পেশিগুলো শক্ত না থাকলে হাঁচি, কাশি বা হঠাৎ ঝাঁকুনি দিলে প্রস্রাব বেরিয়ে যেতে পারে। এই সমস্যার সমাধানে বিশেষ ব্যায়াম বা ফিজিওথেরাপি করানো প্রয়োজন, যা ধীরে ধীরে পেশিকে শক্তিশালী করে এবং প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
4. মেজাজ বদল
সন্তান প্রসবের পর অনেক মায়েরই আচমকা মন খারাপ বা অবসাদের অনুভূতি হওয়া স্বাভাবিক—একে বলা হয় ‘পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন’। শিশুর জন্মের পর জীবন একেবারেই সন্তানকেন্দ্রিক হয়ে যায়, চারপাশের অনেক কিছু বদলে যায়, আর এই হঠাৎ পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চাপ অনেক মায়ের জন্য মানসিক অবসাদের কারণ হতে পারে। তাছাড়া হরমোনের ওঠা-পড়াও মানসিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলে।
যদিও মেজাজ খারাপ বা চুপচাপ হয়ে যাওয়া কিছুটা স্বাভাবিক, কিন্তু যদি এটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে বা দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়, তখন অবশ্যই চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া জরুরি। এই সময়ে অনেক মায়ের জন্য কাউন্সেলিংও প্রয়োজন হতে পারে, যা মানসিক চাপ কমাতে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সাহায্য করে।
5. কোমরের নীচে, তলপেটে ব্যথা
প্রসবের পরে কোমরের মাংসপেশি, নীচের তলপেট ও পেলভিক অঞ্চলে ব্যথা হওয়া স্বাভাবিক। তবে যদি এই ব্যথা সময়ের সঙ্গে কমে না আসে এবং মাসের পর মাস চলতে থাকে, তখন সতর্ক হওয়া জরুরি। অনেক সময় সঠিকভাবে বসার ভঙ্গি না রাখা বা পেলভিক ফ্লোর মাসলের দুর্বলতার কারণে ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এই সমস্যার সমাধানে সঠিক পদ্ধতিতে ব্যায়াম বা ফিজিওথেরাপি দরকার।
শেষ কথা
নতুন মা হওয়া একটা সুন্দর অভিজ্ঞতা, কিন্তু আপনার শরীরও যত্নের দাবিদার। OSF HealthCare-এর Dr. Vanessa Foster বলছেন, “পোস্টপার্টাম কেয়ার এখন শুধু ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত নয়—এটা এক বছর পর্যন্ত।” তাই নিয়মিত ডাক্তারের চেকআপে যান এবং কোনো কিছু অস্বাভাবিক মনে হলে কথা বলুন।
মনে রাখবেন—আপনার শিশুর সবচেয়ে বেশি দরকার একজন সুস্থ মা। নিজের স্বাস্থ্য অবহেলা করবেন না। এই লক্ষণগুলো জানুন, সচেতন থাকুন, এবং প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসা নিন। সময়মতো চিকিৎসা আপনার জীবন বাঁচাতে পারে।








