দীপিকা, কলকাতা: ঋতুস্রাবের সময় তলপেট ও কোমরে যন্ত্রণা হওয়া অনেক মেয়ের জন্য স্বাভাবিক (Period Pain)। তবে যদি যন্ত্রণা অতিরিক্ত হয়, প্রতি মাসে নিয়মিত দেখা দেয় বা সহ্য করা মুশকিল হয়ে ওঠে, তাহলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। ভারী ঋতুস্রাবের সঙ্গে তলপেটের সঙ্গে শরীরের বিভিন্ন অস্থিসন্ধিতে যন্ত্রণা দেখা দিতে পারে। অনেক সময় এটি এতটাই তীব্র হয় যে ব্যথানাশকও কার্যকর হয় না। এই ধরনের সমস্যা বিভিন্ন কারণে হতে পারে। বিশেষ কিছু উপসর্গ চিনে নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি, যাতে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানো যায়।
মাসিকের দিনগুলোতে তলপেটব্যথা
প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন মহিলা এমন যন্ত্রণাদায়ক ঋতুস্রাবের সমস্যায় ভোগেন (Period Pain)। এই কয়েকটি দিন তাদের কাছে প্রায় দুঃস্বপ্নের মতো হয়ে ওঠে। অনেকেই হটব্যাগ, প্যারাসিটামল বা অন্যান্য ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহার করে কষ্ট কমানোর চেষ্টা করেন। এই ধরনের তীব্র যন্ত্রণা অনেক সময়ই ইউটারাস ফাইব্রয়েডের কারণে হতে পারে, তবে এর পাশাপাশি আরও কিছু কারণও থাকতে পারে। তাই এই সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী বা অতিরিক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
হরমোনের ওঠানামা এবং জরায়ুর সঙ্কোচনের কারণে পেট, তলপেট ও কোমরে তীব্র যন্ত্রণা হতে পারে। এমনকি শরীরের বিভিন্ন অস্থিসন্ধিতেও ব্যথা অনুভূত হয়। এই ধরনের সমস্যা মূলত হরমোনের অস্বাভাবিকতার কারণে ঘটে, যা প্রাইমারি ডিসমেনোরিয়া নামে পরিচিত। হরমোনের তারতম্যের কারণে মেয়েদের মেজাজও প্রভাবিত হয় এবং মানসিক চাপ, জ্বালাপোড়া বা বিরক্তির মতো অনুভূতি দেখা দিতে পারে।
আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপে যুক্ত হোন -
‘ইউটেরাইন ফাইব্রয়েড’ও ঋতুস্রাবের সময় যন্ত্রণার একটি প্রধান কারণ হতে পারে। ফাইব্রয়েড হল জরায়ুর প্রাচীরে গজানো টিউমার, যা সাধারণত ক্যানসার সৃষ্টিকারী নয়। তবে যদি টিউমারের সংখ্যা বা আকার বাড়তে থাকে, তা সমস্যা তৈরি করতে পারে। এতে সন্তানধারণে অসুবিধা হতে পারে এবং ঋতুচক্রও অনিয়মিত হয়ে যায়। জরায়ুর মায়োমেট্রিয়াম পেশি থেকে টিউমার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়, পেশির কোষগুলি অনিয়মিতভাবে বাড়ে এবং ছোট ছোট টিউমার তৈরি হয়, যা ব্যথার কারণ হয়। যদি টিউমার জরায়ুর বাইরের দিকে গজায়, সেটি সাবসেরোসাল ফাইব্রয়েড বলা হয়, যা ফেটে গেলে জরায়ুতে রক্তপাতও ঘটাতে পারে। তাই আগে থেকেই সতর্ক থাকা জরুরি।
জরায়ুতে সিস্টও ঋতুস্রাবের গোলমাল এবং তলপেটের অসহ্য যন্ত্রণার অন্যতম কারণ হতে পারে (Period Pain)। এর মূল কারণ হলো ইস্ট্রোজেন হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া। সাম্প্রতিক সময়ে মেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে বড় শারীরিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে ‘ওভারিয়ান সিস্ট’। এর ফলে ঋতুচক্র অনিয়মিত হয়, কখনও অতিরিক্ত রক্তপাত হয়, আবার অল্প বয়সে ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। অনেকের জন্য ঋতুস্রাব খুব বেদনাদায়ক হয়। এছাড়া খাওয়াদাওয়ায় অনিয়ম, নেশার অভ্যাস এবং দেরিতে গর্ভধারণের চেষ্টা এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই সঠিক চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন জরুরি।
এন্ডোমেট্রিয়োসিসও ঋতুস্রাবের সময়ে তলপেট, কোমর ও পেটে ব্যথার কারণ হতে পারে। অনেক সময় এন্ডোমেট্রিয়োসিস থাকলেও কোনো লক্ষণ দেখা দেয় না এবং বন্ধ্যাত্ব বা অন্য পরীক্ষা করার সময়ই ধরা পড়ে। রোগটি স্টেজ-১ বা স্টেজ-২ হলে সাধারণত তেমন সমস্যা হয় না। কিন্তু স্টেজ-৩ বা স্টেজ-৪ হলে রক্তপাত অনেক বেশি হয় এবং ঋতুস্রাবের সময় তীব্র যন্ত্রণা দেখা দেয়। প্রস্রাব বা মলত্যাগের সময়ও ব্যথা হতে পারে। অতিরিক্ত রক্তপাতের কারণে রক্তাল্পতার লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যার ফলে কাজের অনীহা, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, মাথা ঝিমঝিম ভাব এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়।
ঋতুস্রাবের সময় পেট ব্যথা? মুক্তি পান এই ৭টি জাদুকরী ঘরোয়া উপায়ে!
পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব—প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়ম। কিন্তু এই নিয়মের সাথে ফ্রি গিফট হিসেবে আসা সেই অসহ্য পেট ব্যথা বা ক্র্যাম্প? ওটা বোধহয় কেউ খুব একটা পছন্দ করেন না। মাসের ওই কয়েকটা দিন মনে হয় পেটের ভেতর কেউ যেন যুদ্ধ চালাচ্ছে! বিজ্ঞানের ভাষায় একে আমরা ‘ডিসমেনোরিয়া’ বলি, কিন্তু সহজ বাংলায় এটা হলো এক চরম অস্বস্তি।
১. গরম সেঁক (Heat Therapy): আপনার পরম বন্ধু
হিট থেরাপি মাসিকের ব্যথা কমানোর একটি সহজ, সাধারণ এবং কার্যকর উপায়। আপনার তলপেটে হিটিং প্যাড বা উষ্ণ জলের বোতল ব্যবহার করলে পেশী শিথিল হয়, রক্ত চলাচল ভালো হয় এবং আরামদায়ক অনুভূতি দেয়, যা ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। তাপ পেশী শিথিল করে ব্যথার সংকেতও কমায়। প্রয়োজনে একবারে ১৫–২০ মিনিটের জন্য হিট প্যাড ব্যবহার করা যায়, যা আপনাকে দ্রুত স্বস্তি দিতে পারে।
- কিভাবে কাজ করে: গরম পানির ব্যাগ বা হিটিং প্যাড তলপেটে রাখলে পেশীগুলো শিথিল হয় এবং রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়।
- টিপস: একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৪০° সেলসিয়াস তাপমাত্রার সেঁক পেইনকিলারের মতোই কার্যকর হতে পারে।
২. আদা চা: প্রকৃতির পেইনকিলার
কিছু ভেষজ চায়ে এমন প্রাকৃতিক গুণ রয়েছে যা পিরিয়ড ক্র্যাম্প এবং পেটের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। উদাহরণস্বরূপ, ক্যামোমাইল চায়ের প্রদাহ-হ্রাসকারী বৈশিষ্ট্য পেশী শিথিল করতে এবং ব্যথা কমাতে সহায়ক। আদা চা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে হজমের সমস্যা দূর করতে এবং প্রদাহ কমাতে ব্যবহার হয়ে আসছে। পেপারমিন্ট চা পেট ফোলাভাব এবং ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। আরাম পেতে দিনে দুইবার এই চায়ের ব্যবহার করতে পারেন।
- প্রস্তুত প্রণালী: এক টুকরো আদা থেঁতো করে গরম পানিতে ফুটিয়ে নিন। সামান্য মধু বা লেবু মিশিয়ে দিনে ২-৩ বার পান করুন।
- যুক্তি: আদা সরাসরি ব্যথানাশক ওষুধের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে, যা আপনার পাকস্থলীর কোনো ক্ষতি করবে না।
৩. পর্যাপ্ত পানি পান এবং হাইড্রেটেড থাকা
পিরিয়ড বা মাসিক চক্রের সময় ফোলাভাব এবং পেটের অস্বস্তি দূর করতে পর্যাপ্ত পানি পান করে হাইড্রেটেড থাকুন। এছাড়াও, সারাদিন প্রচুর পরিমাণে তরল পান করে কোষ্ঠকাঠিন্য এড়ানো যায়, যা টক্সিন নির্মূল করতে এবং জল ধারণ কমাতেও সাহায্য করতে পারে। আপনার শরীরকে হাইড্রেটেড রাখা আপনাকে নিয়মিত মলত্যাগ বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। সাধারণত প্রতিদিন 8 থেকে 10 গ্লাস জল খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। আপনি আপনার খাদ্যতালিকায় তরমুজ, শসা এবং সাইট্রাস ফলের মতো হাইড্রেটিং খাবারও যোগ করতে পারেন।
- কেন খাবেন: গরম পানি পান করলে শরীরের রক্ত প্রবাহ বাড়ে এবং পেশীগুলো শান্ত থাকে।
- টিপস: শসা, তরমুজ বা ডাবের পানির মতো হাইড্রেটিং খাবার খাদ্যতালিকায় রাখুন।
অপরিহার্য তেল
- বেশ কিছু প্রয়োজনীয় তেলের এমন গুণ রয়েছে যা মাসিকের ব্যথা উপশম করতে সাহায্য করে। সঠিকভাবে ব্যবহার করা হলে এই অপরিহার্য তেলগুলিতে ল্যাভেন্ডার এবং ক্লারি সেজ তেলের শিথিল এবং প্রশান্তিদায়ক বৈশিষ্ট্যগুলি সুপরিচিত। আপনি এসেনশিয়াল অয়েলের কয়েক ফোঁটা নিতে পারেন এবং নারকেল বা জোজোবা তেলের মতো ক্যারিয়ার তেলের সাথে মিশিয়ে আপনার নীচের পেটে ম্যাসাজ করতে পারেন। একটি ডিফিউজারে কয়েক ফোঁটা যোগ করে, আপনি সুগন্ধ শ্বাস নিতে পারেন। উচ্চ-মানের, খাঁটি অপরিহার্য তেল ব্যবহার করতে ভুলবেন না এবং আপনি যদি কোনও ফুসকুড়ি লক্ষ্য করেন বা কোনও জ্বালা অনুভব করেন তবে সেগুলি ব্যবহার বন্ধ করা গুরুত্বপূর্ণ।
৫. মেথি পানির কারিশমা
বাঙালি রান্নাঘরে মেথি থাকবে না, তা কি হয়? আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে মেথিকে পিরিয়ডের ব্যথার মহৌষধ বলা হয়।
- ব্যবহার: এক চা-চামচ মেথি সারারাত পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। সকালে সেই পানি ছেঁকে পান করুন। এটি লিভার পরিষ্কার রাখে এবং হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
৬. হালকা ব্যায়াম ও যোগব্যায়াম
নিয়মিত ব্যায়াম মাসিকের ব্যথা কমাতে খুবই কার্যকর। প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা স্ট্রেচিং করলে রক্ত প্রবাহ বাড়ে এবং পিরিয়ড ক্র্যাম্পও কমে। ব্যায়ামের ফলে শরীরে উৎপন্ন এন্ডোরফিন প্রাকৃতিক ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে। হাঁটা, সাঁতার বা হালকা যোগব্যায়াম পেলভিক অঞ্চলে রক্ত চলাচল ভালো রাখে, পেশীর টান কমায় এবং ক্র্যাম্প সহজ করে। মাসিক স্বস্তির জন্য সপ্তাহের বেশিরভাগ দিন অন্তত ৩০–৪৫ মিনিট মাঝারি ধরনের ব্যায়াম করার চেষ্টা করুন।
- সহজ ব্যায়াম: হাঁটাহাঁটি বা প্রাণায়াম (নিঃশ্বাসের ব্যায়াম) করতে পারেন। তবে এই সময় ভারী জিম বা খুব কঠিন কসরত এড়িয়ে চলাই ভালো।
৭. সঠিক খাদ্যাভ্যাস: ম্যাগনেসিয়াম ও ওমেগা-৩
এই সময় ভাজাপোড়া বা অতিরিক্ত লবণাক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন। লবণ শরীরে পানি জমিয়ে রাখে, যা পেট ফাঁপা বাড়ায়।
- কি খাবেন: কলা (ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ), ডার্ক চকলেট এবং ওমেগা-৩ যুক্ত খাবার (যেমন তিসি বা আখরোট) খান। ডার্ক চকলেট আপনার মুড ভালো রাখতেও সাহায্য করবে—এটা তো বোনাস!
