কুসুম দাস, কলকাতাঃ সিজারের পর মায়ের শরীর কিছুটা দুর্বল থাকে, তাই এই সময়ে সঠিক যত্ন নেওয়া খুবই জরুরি। অপারেশনের ক্ষত দ্রুত শুকানো, সংক্রমণ এড়ানো এবং শরীরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার ও প্রয়োজনীয় পরিচর্যা দরকার। পরিবারের সদস্যদেরও মাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে সহযোগিতা করা উচিত। সঠিকভাবে যত্ন নিলে মা দ্রুত সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
সন্তান জন্মের আগে মায়ের যত্ন কিভাবে করবেন?
সন্তান জন্মের আগে ও পরে সিজারিয়ান মায়ের যত্ন কেমন হওয়া উচিত এগুলো জেনে রাখা খুবই প্রয়োজন কারণ সন্তান জন্মের আগে মায়ের অনেক যত্ন নিতে হয় আর যদি সঠিক যত্ন না নিতে পারেন তাহলে এতে করে মা এবং সন্তান দুজনের জন্য এটা ক্ষতিকর হতে পারে। তাই আগে আপনারা জেনে নিন সন্তান জন্মের আগে মায়ের কিভাবে যত্ন নিতে হবে।
1) সঠিক ও পুষ্টিকর খাবার: একজন গর্ভবতী মায়ের যত্নের সবচেয়ে বড় অংশ হলো স্বাস্থ্যকর এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়া। কারণ মা যা খান, সেটাই গর্ভের সন্তানের কাছে পুষ্টি হিসেবে পৌঁছায়। তাই ফল, শাকসবজি, দুধ, ডাল, মাছ, ডিম ও মাংসের মতো পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন। এতে মা সুস্থ থাকবেন আর শিশুও সঠিকভাবে বেড়ে উঠবে।
2) প্রসবের তারিখ গণনা: গর্ভাবস্থায় সন্তানের সম্ভাব্য জন্ম তারিখ জানা খুব জরুরি। এতে মা ও পরিবারের সবাই আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে পারবেন। এজন্য নিয়মিত ডাক্তারের কাছে চেকআপ করাতে হবে এবং নিজেরও একটি আনুমানিক তারিখ হিসাব করে রাখা উচিত। এতে হঠাৎ কোনো বিপত্তি এড়ানো যায়।
3) সঠিক সময়ে টিকা গ্রহণ: গর্ভবতী মায়ের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে টিকা নেওয়া খুবই প্রয়োজনীয়। বিশেষ করে গর্ভাবস্থার ৫ থেকে ৮ মাসের মধ্যে দু’টি টিটি (TT) টিকা নেওয়া উচিত। এটি মা ও শিশুর উভয়ের জন্য সুরক্ষা দেয় এবং ভবিষ্যতে জটিলতা কমায়।
4) ভারী কাজ এড়িয়ে চলুন: গর্ভবতী মহিলাকে দিয়ে কোনো ভারী কাজ করানো উচিত নয়। আর আপনি যদি নিজেই গর্ভবতী হন, তবে অবশ্যই ভারী কাজ থেকে দূরে থাকুন।
5) বিশ্রাম ও পর্যাপ্ত ঘুম: মানসিক চাপ বা অতিরিক্ত চিন্তা করবেন না। প্রতিদিন পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন এবং নিয়মিত ঘুমানোর অভ্যাস করুন। এতে মা ও শিশুর দুজনেরই স্বাস্থ্য ভালো থাকবে।
6) দীর্ঘ ভ্রমণ এড়িয়ে চলুন: বিশেষ করে শেষের কয়েক মাস একেবারেই ভ্রমণ করবেন না। দীর্ঘ পথ ভ্রমণ মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
7) পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকুন: নিয়মিত গোসল করুন, হাত-পা, দাঁত ও মাথার চুল পরিষ্কার রাখুন। গর্ভাবস্থায় একটু বাড়তি যত্ন নেওয়া খুবই জরুরি।
8) ঢিলেঢালা পোশাক পরুন: পেটে চাপ লাগে এমন টাইট পোশাক এড়িয়ে চলুন। আরামদায়ক সুতি কাপড়ের ঢিলেঢালা পোশাক ব্যবহার করুন।
সিজারের পর মায়ের যত্ন কিভাবে নিবেন
সিজারের পর মায়ের যত্ন কিভাবে নিবেন এই বিষয়ে জ্ঞান রাখা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বিষয়। কারণ সিজারের পর সবচেয়ে বেশি যত্নের প্রয়োজন হয় কিন্তু অনেকেই হয়তো জানে না সিজারের পর মায়ের যত্ন কিভাবে নিবেন বা নিতে হয়। এতে করে সঠিক যত্ন না নেওয়ার ফলে বিভিন্ন রকম সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় তাই জেনে রাখুন সিজারের পর মায়ের যত্ন কিভাবে নিবেন সেই উপায় গুলো। সিজারের পর মায়ের যত্ন কিভাবে নিবেন তার উপায় গুলো হলোঃ
1) কাটা অংশের যত্ন নেওয়া: সিজারের সময় যেহেতু পেটে একটি অংশ কাটা হয়, তাই ওই স্থানের যত্ন নেওয়া খুব জরুরি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে যাতে কোনোভাবে সংক্রমণ বা ঘা না হয়।
2) পুষ্টিকর খাবার খাওয়া: সন্তান জন্মের পর মায়ের শরীরে অনেক পুষ্টির ঘাটতি দেখা দেয়। আবার এ সময় শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে হয়, তাই মায়ের জন্য বেশি বেশি ভিটামিন ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া অত্যন্ত দরকার। এতে মা দ্রুত শক্তি ফিরে পাবেন এবং শিশুও সুস্থভাবে বেড়ে উঠবে।
3) দুধ খাওয়ানোর সময় সঠিক ভঙ্গি: সিজারের পর মায়ের পেটে সেলাই থাকে, তাই বারবার নিচু হয়ে শিশুকে কোলে নেওয়া ঠিক নয়। শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য সঠিকভাবে বসা বা শোয়ার ভঙ্গি ঠিক করতে হবে, যাতে পেটে চাপ না পড়ে।
4) ঘাড় ও কোমরের ব্যথা কমানো: অনেক মায়ের সিজারের পর ঘাড় বা কোমরে ব্যথা হতে পারে। এই ব্যথা কমাতে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া খুব দরকার।
5) ভারী কাজ এড়ানো: সিজারের পরে ভারী কোনো কাজ একেবারেই করা উচিত নয়। এতে পেটের কাটা অংশে টান পড়ে ক্ষতি হতে পারে।
6) পর্যাপ্ত পানি পান: অনেক সময় মায়েরা ভয় পান যে পানি বেশি খেলেই টয়লেটে অসুবিধা হবে। কিন্তু এই ভয় একেবারেই অমূলক। শরীর সুস্থ রাখতে প্রচুর পানি পান করা জরুরি।
7) অন্য যত্নগুলোও মনে রাখা দরকার: উপরোক্ত বিষয়গুলোর পাশাপাশি আরও অনেক ছোটখাটো যত্ন রয়েছে যা একবারে বলা যায় না। তবে নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলা এবং সঠিক যত্ন নেওয়াই সবচেয়ে জরুরি।
সিজারের কতদিন পর সেলাই শুকায়
সিজারের পর সেলাই শুকাতে কতদিন লাগবে, তা সবার ক্ষেত্রে এক নয়। সাধারণত ক্ষত শুকাতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে, তবে পুরোপুরি সুস্থ হতে আরও বেশি সময় লাগতে পারে। ক্ষতস্থানে রক্তপাত, পুঁজ, অতিরিক্ত ব্যথা বা ফোলা দেখা দিলে সংক্রমণের আশঙ্কা থাকতে পারে। তাই এমন লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সিজারের কতদিন পর বাচ্চা নেওয়া যায়
সিজারের পর মায়ের শরীর পুরোপুরি সুস্থ হতে কিছুটা সময় লাগে। তাই পরবর্তী গর্ভধারণের আগে পর্যাপ্ত সময়ের ব্যবধান রাখা গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে সিজারের পর অন্তত ১৮–২৪ মাস অপেক্ষা করে পরবর্তী সন্তান নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়, তবে মায়ের শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী সময়টা চিকিৎসক নির্ধারণ করতে পারেন।
শেষ কথা
সন্তান জন্মের আগে ও পরে একজন সিজারিয়ান মায়ের যত্ন কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা আমরা সবাই জানি। আজকের আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করেছি— সিজারের আগে ও পরে মায়ের যত্ন কেমন হওয়া উচিত, সিজারের পর কীভাবে যত্ন নিতে হবে, কতদিনে সেলাই শুকায় এবং কতদিন পর আবার বাচ্চা নেওয়া যায়— এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে। আশা করছি আপনারা বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছেন।
